নরসিংদীর শিবপুর উপজেলার পুটিয়া ইউনিয়নের পুরান্দিয়া বাসস্ট্যান্ড এলাকায় অবস্থিত ১০০ নম্বর পুরান্দিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ঠিক সীমানার পাশে একটি ব্যাটারি পুনর্ব্যবহার কারখানা কাজ করছে। এই কারখানায় পুরাতন ব্যাটারি ভেঙে পুড়িয়ে সীসা ও অন্যান্য ধাতু সংগ্রহ করা হয়, যার ফলে উৎপন্ন কালো ধোঁয়া আশেপাশের বায়ুতে ছড়িয়ে পড়ে। ফলস্বরূপ, বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, শিক্ষক এবং কাছাকাছি বসবাসকারী হাজারো মানুষ শ্বাসপ্রশ্বাসের সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছে।
কারখানাটি এশিয়া কার বিডি লিমিটেড নামে পরিচালিত এবং নিয়মিতভাবে পুরাতন ব্যাটারি পুড়িয়ে সীসা নিষ্কাশন করে। পুড়িয়ে বের হওয়া ধোঁয়া কেবল কালো রঙের নয়, তাতে সীসা, পারদ এবং অন্যান্য বিষাক্ত পদার্থের মিশ্রণ থাকে, যা শ্বাসনালী ও চোখের জন্য হানিকর। স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন যে ধোঁয়ার ঘনত্ব বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাতাসে গন্ধ এবং দৃষ্টিগোচর ধোঁয়া স্পষ্ট হয়ে ওঠে, যা শিশুদের স্বাভাবিক শিখন পরিবেশকে ব্যাহত করে।
বিদ্যালয়ের এক অভিভাবক উল্লেখ করেছেন, পুরাতন ব্যাটারি পুড়িয়ে নতুন ব্যাটারি তৈরির প্রক্রিয়ায় যে ধোঁয়া বের হয়, তা পুরো এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে এবং শিশুরা শ্বাস নিতে কষ্ট পাচ্ছে। তিনি আরও জানান, ধোঁয়ার গন্ধ এবং কালো ধোঁয়া পরিবেশকে অস্বস্তিকর করে তুলেছে, ফলে শিশুদের স্বাস্থ্যের ওপর দীর্ঘমেয়াদী প্রভাবের আশঙ্কা বাড়ছে।
বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক সজিব মিয়া জানান, ধোঁয়া কখনো কখনো পুরো ক্লাসরুমকে ঢেকে দেয়, ফলে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা স্বাভাবিকভাবে শ্বাস নিতে পারে না। তিনি উল্লেখ করেন, কিছু শিশুর চোখে জ্বালাপোড়া দেখা দিয়েছে এবং শ্বাসকষ্টের অভিযোগ বাড়ছে। শিক্ষকগণ ইতিমধ্যে কিছু শিক্ষার্থীকে বাড়িতে পাঠিয়ে দিচ্ছেন, তবে ধারাবাহিক ধোঁয়া সমস্যার কারণে শিক্ষার ধারাবাহিকতা বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে।
শিক্ষার্থীরাও একই সমস্যার কথা জানিয়েছেন; তারা বলছে ধোঁয়ার কারণে চোখে জ্বালা ও শ্বাস নিতে অসুবিধা হচ্ছে। কিছু শিশু দীর্ঘ সময়ের জন্য ধোঁয়ার মধ্যে থাকায় শ্বাসকষ্টের শিকার হয়েছে, যা তাদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
শিবপুর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা মোহাম্মদ মোস্তানশির বিল্লাহ উল্লেখ করেন, ধোঁয়া—যে রঙের হোক না কেন—স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর, বিশেষ করে শিশুদের ক্ষেত্রে। তিনি বলেন, সীসা ও পারদযুক্ত ধোঁয়ার দীর্ঘমেয়াদী সংস্পর্শে শ্বাসযন্ত্রের রোগ, চোখের সমস্যা এবং স্নায়বিক বিকারসহ বিভিন্ন জটিলতা দেখা দিতে পারে।
বিষাক্ত ধোঁয়ার প্রভাব শুধুমাত্র শ্বাসযন্ত্রেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি ত্বক ও চোখের সংবেদনশীলতা বাড়িয়ে দেয়। স্থানীয় স্বাস্থ্য কর্মীরা জানিয়েছেন, ধোঁয়ার সংস্পর্শে থাকা শিশুদের মধ্যে অ্যানেমিয়া, শ্বাসকষ্ট এবং চোখের জ্বালাপোড়ার ঘটনা বাড়ছে। দীর্ঘমেয়াদে সীসা বিষক্রিয়া হওয়ার সম্ভাবনা থাকায়, দ্রুত হস্তক্ষেপের প্রয়োজনীয়তা তীব্রতর হয়েছে।
স্থানীয় ব্যবসায়ী আমির হোসেনের মতে, বাজারের বিক্রয় ও গ্রাহক সংখ্যা ধোঁয়ার কারণে প্রভাবিত হয়েছে। তিনি উল্লেখ করেন, ধোঁয়ার গন্ধ ও দৃষ্টিগোচর দূষণ গ্রাহকদের কেনাকাটার ইচ্ছা কমিয়ে দিচ্ছে, ফলে স্থানীয় অর্থনীতিতেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
উপজেলা প্রশাসন এখন পর্যন্ত কোনো নির্দিষ্ট পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি, তবে বাসিন্দা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা দ্রুত হস্তক্ষেপের দাবি জানাচ্ছেন। তারা কারখানার কার্যক্রমে কঠোর নিয়ন্ত্রণ, ধোঁয়া নির্গমন কমানোর প্রযুক্তি প্রয়োগ এবং বিকল্প পুনর্ব্যবহার পদ্ধতি অনুসন্ধানের আহ্বান জানাচ্ছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ব্যাটারি পুনর্ব্যবহারে সীসা ও পারদযুক্ত ধোঁয়া নির্গমন রোধের জন্য আধুনিক ফিল্টারেশন সিস্টেম ও ধোঁয়া শোষণ প্রযুক্তি ব্যবহার করা জরুরি। এছাড়া, কারখানার অবস্থানকে ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় না রেখে শিল্প পার্কে স্থানান্তর করা পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য উপকারী হতে পারে।
অবিলম্বে পদক্ষেপ না নিলে, শিশুরা দীর্ঘমেয়াদে শ্বাসযন্ত্রের রোগ, দৃষ্টিশক্তি হ্রাস এবং স্নায়বিক বিকারসহ গুরুতর স্বাস্থ্য সমস্যার শিকার হতে পারে। তাই, স্থানীয় কর্তৃপক্ষ, স্বাস্থ্য বিভাগ এবং শিল্প সংস্থার সমন্বয়ে দ্রুত সমাধান খুঁজে বের করা জরুরি, যাতে শিশুরা নিরাপদ ও স্বাস্থ্যকর পরিবেশে শিক্ষা ও বিকাশের সুযোগ পায়।



