গ্রিনল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী জেন্স‑ফ্রেডেরিক নিলসেন সোমবার কুইনসটাউন‑এ একটি সংবাদ সম্মেলনে যুক্তরাষ্ট্রের কোনো “রাতারাতি” দখল পরিকল্পনা নেই বলে স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেন। তিনি উল্লেখ করেন, ভেনেজুয়েলার মতো পরিস্থিতি গ্রিনল্যান্ডে প্রযোজ্য নয় এবং দেশের গণতান্ত্রিক কাঠামো বহু বছর ধরে অটুট রয়েছে।
নিলসেন বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের মন্তব্যের ফলে কিছু উদ্বেগ দেখা দিয়েছে, তবে তা অপ্রয়োজনীয়। তিনি জোর দিয়ে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের গ্রিনল্যান্ডে শাসন গ্রহণের কোনো বাস্তবিক সম্ভাবনা নেই এবং তাই জনগণকে আতঙ্কিত হওয়ার দরকার নেই।
প্রধানমন্ত্রী আরও উল্লেখ করেন, গ্রিনল্যান্ডকে ভেনেজুয়েলার সঙ্গে তুলনা করা সঠিক নয়, কারণ দুই দেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপট সম্পূর্ণ ভিন্ন। গ্রিনল্যান্ডের স্বায়ত্তশাসন ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া দীর্ঘদিন ধরে বজায় আছে, যা কোনো বহিরাগত শক্তির হস্তক্ষেপকে কঠিন করে তুলেছে।
নিলসেনের মতে, মিডিয়ার মাধ্যমে পাল্টাপাল্টি বক্তব্যের বদলে সরাসরি সংলাপই সমস্যার সমাধানের সঠিক পথ। তিনি সরকারকে আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে খোলামেলা যোগাযোগ বজায় রাখতে আহ্বান জানান, যাতে ভুল বোঝাবুঝি দূর হয়।
যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য দখল নিয়ে গুজবের প্রতি নিলসেনের প্রতিক্রিয়া ছিল দৃঢ়। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, গ্রিনল্যান্ডের ভূখণ্ডিক অখণ্ডতা রক্ষা করা আন্তর্জাতিক আইনের অধীনে অপরিহার্য, এবং কোনো বহিরাগত শক্তি স্বেচ্ছায় তা লঙ্ঘন করতে পারে না।
এছাড়া, তিনি দুই দেশের মধ্যে পূর্বে গড়ে ওঠা সহযোগিতামূলক সম্পর্ক পুনরুদ্ধারের গুরুত্বেও জোর দেন। নিলসেনের মতে, পারস্পরিক আস্থা ও সহযোগিতা গ্রিনল্যান্ডের উন্নয়ন ও নিরাপত্তার জন্য অপরিহার্য, এবং তা বজায় রাখতে উভয় পক্ষেরই ইচ্ছা প্রকাশ করা উচিত।
জনসাধারণের উদ্বেগের প্রতি নিলসেন সহানুভূতি প্রকাশ করে বলেন, গ্রিনল্যান্ড বর্তমানে বিশেষ চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি, তবে সরকার সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা চালিয়ে পরিস্থিতি স্থিতিশীল রাখবে। তিনি জনগণের আশ্বাস দেন যে, সরকার তাদের নিরাপত্তা ও স্বার্থ রক্ষায় সব ধরনের পদক্ষেপ নেবে।
সামরিক সম্ভাবনা নিয়ে অযথা অনুমানকে নিলসেন কঠোরভাবে নাকচ করেন। তিনি বলেন, কাল্পনিক বা সম্ভাব্য সামরিক অভিযানের কথা বলা উপযুক্ত নয় এবং এ ধরনের কথাবার্তা জনমতকে অস্থির করতে পারে।
ইউনাইটেড নেশনসের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের মন্তব্যও একই দিনে প্রকাশ পায়, যেখানে তিনি ভেনেজুয়েলায় মার্কিন সামরিক হস্তক্ষেপকে আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন হিসেবে চিহ্নিত করেন। গুতেরেসের মতে, আন্তর্জাতিক আইনই বিশ্বশান্তি ও নিরাপত্তার ভিত্তি, এবং তা লঙ্ঘন করা কোনো পরিস্থিতিতে গ্রহণযোগ্য নয়।
গুতেরেস ভেনেজুয়েলান নেতা নিকোলাস মাদুরো ও তার স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসের আটক সংক্রান্ত সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়া নিয়ে বিশেষ উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি সতর্ক করেন, এই ধরনের পদক্ষেপ দেশীয় অস্থিরতা বাড়িয়ে তুলতে পারে এবং পুরো অঞ্চলে অনিশ্চয়তা সৃষ্টি করতে পারে।
মহাসচিবের মতে, ভেনেজুয়েলায় দীর্ঘদিনের অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা, সামাজিক ও অর্থনৈতিক সংকটের ফলে গণতন্ত্রের কাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং লক্ষ লক্ষ মানুষ দেশ ত্যাগ করেছে। এই পরিস্থিতি যদি সঠিকভাবে পরিচালিত না হয়, তবে বৃহত্তর সংঘাতে রূপ নিতে পারে।
গুতেরেস জোর দিয়ে বলেন, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উচিত শান্তিপূর্ণ সমাধানের পথে অটল থাকা এবং আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান খোঁজা। তিনি উল্লেখ করেন, সঠিক পদক্ষেপের মাধ্যমে বড় ধরণের ধ্বংসাত্মক সংঘাত এড়ানো সম্ভব।
গ্রিনল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী ও ইউএন মহাসচিবের উভয়ই একমত যে, আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ভিত্তি হল পারস্পরিক সম্মান ও আইনের শাসন। নিলসেনের বক্তব্যে দেখা যায়, দেশীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে স্বচ্ছতা ও সরাসরি সংলাপের প্রয়োজনীয়তা, আর গুতেরেসের মন্তব্যে আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি অটল প্রতিশ্রুতি।
এই দুই বিবৃতি একসাথে আন্তর্জাতিক মঞ্চে একটি স্পষ্ট বার্তা দেয়: কোনো দেশই অন্য দেশের সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘন করে স্বল্পমেয়াদী স্বার্থ অর্জন করতে পারে না, এবং এমন কোনো পদক্ষেপে বিশ্ব শান্তি ও নিরাপত্তা ঝুঁকিতে পড়ে।
পরবর্তী সময়ে গ্রিনল্যান্ডের সরকার যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক আলোচনার মাধ্যমে পারস্পরিক স্বার্থের বিষয়গুলো সমাধান করার পরিকল্পনা করছে, একই সঙ্গে ভেনেজুয়েলা পরিস্থিতি নিয়ে আন্তর্জাতিক সংস্থা ও দেশগুলোর সঙ্গে সমন্বয় বজায় রাখবে। এই প্রক্রিয়ায় আন্তর্জাতিক আইনের মানদণ্ডকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে এবং কোনো হস্তক্ষেপের ঝুঁকি কমাতে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা বাড়ানো হবে।
সামগ্রিকভাবে, গ্রিনল্যান্ডের স্বায়ত্তশাসন ও নিরাপত্তা রক্ষার জন্য নিলসেনের দৃঢ় অবস্থান এবং ভেনেজুয়েলা বিষয়ক গুতেরেসের সতর্কতা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে আইনি ও কূটনৈতিক পথে সমস্যার সমাধান করার প্রয়োজনীয়তা পুনর্ব্যক্ত করে।



