থাইল্যান্ডের সেনাবাহিনী মঙ্গলবার ক্যাম্বোডিয়ার সীমান্তে মর্টার গুলি চালিয়ে উবন রাচথানি প্রদেশে এক সৈন্যকে শ্যাঁতসেঁতে শেলের আঘাতে আহত করেছে এবং তাকে চিকিৎসার জন্য স্থানান্তর করা হয়েছে। থাই সেনাবাহিনীর প্রকাশ্য বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ক্যাম্বোডিয়ার সশস্ত্র বাহিনী দশ দিন আগে স্বাক্ষরিত চুক্তি লঙ্ঘন করে গুলি চালিয়েছে।
হতাহত সৈন্যের শারীরিক অবস্থার তথ্য জানানো হয়নি, তবে শেল থেকে ছড়িয়ে পড়া ধাতব টুকরো তার দেহে আঘাত হানে এবং তাৎক্ষণিক চিকিৎসা নেওয়া হয়েছে। আহত সৈন্যকে নিকটস্থ সামরিক হাসপাতাল থেকে রেফার করা হয়েছে, যেখানে তাকে জরুরি সেবা প্রদান করা হচ্ছে।
থাই সেনাবাহিনীর মুখপাত্রের মতে, গুলির সঠিক সময়কাল ছিল সকালবেলা, যখন সীমান্তের নিকটবর্তী গ্রামগুলো এখনও নিঃশব্দ ছিল। উবন রাচথানি প্রদেশের কয়েকটি গ্রামেই শেলধ্বংসের ধ্বনি শোনা গিয়েছিল, তবে কোনো বেসামরিক প্রাণহানি রিপোর্ট করা হয়নি।
এই ঘটনা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দুই প্রতিবেশী দেশের মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী সীমান্ত বিরোধের নতুন এক পর্ব হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। থাইল্যান্ড ও ক্যাম্বোডিয়া বহু দশক ধরে গাছের রোপণ, নদীর প্রবাহ এবং সীমান্তের সীমানা নিয়ে মতবিরোধে জর্জরিত, যা কখনো কখনো সামরিক উত্তেজনার রূপ নেয়।
গত বছরই দুই দেশের মধ্যে তীব্র সংঘর্ষের শিখা জ্বলে উঠেছিল। ডিসেম্বর মাসে সীমান্তে গুলি চালানো, বোমা বিস্ফোরণ এবং গুলিবর্ষণ ঘটায় শতাধিক মানুষ প্রাণ হারায় এবং প্রায় এক মিলিয়ন মানুষ উভয় পাশে শরণার্থী হয়ে পড়ে। এই সহিংসতা তিন সপ্তাহের মধ্যে ২৭ ডিসেম্বর পর্যন্ত অব্যাহত ছিল, যার ফলে উভয় দেশের সরকারকে আন্তর্জাতিক চাপের মুখে ধরা পড়ে।
বহু আন্তর্জাতিক সংস্থা, বিশেষ করে আঞ্চলিক সংস্থা ASEAN, দ্রুত হস্তক্ষেপ করে এবং দুই পক্ষকে শান্তি বজায় রাখতে আহ্বান জানায়। শেষ পর্যন্ত ২৭ ডিসেম্বর একটি সাময়িক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়, যা ত্রিশ দিনের মধ্যে যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করে এবং সীমান্তে অস্ত্রবিরতির নিশ্চয়তা দেয়। এই চুক্তি তৎকালীন সংঘর্ষের তীব্রতা কমাতে সহায়তা করে এবং শরণার্থীদের নিরাপদে ফিরে আসার সুযোগ তৈরি করে।
তবে আজকের মর্টার হামলা সেই চুক্তির শর্ত লঙ্ঘনের স্পষ্ট উদাহরণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। ক্যাম্বোডিয়ার সরকার এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেনি, এবং থাই কর্তৃপক্ষের অনুরোধে তারা কোনো ব্যাখ্যা প্রদান করেনি। এই অনিচ্ছা আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়িয়ে তুলেছে, কারণ চুক্তি লঙ্ঘন ভবিষ্যতে আরও বড় সংঘর্ষের সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে।
আঞ্চলিক বিশ্লেষকরা উল্লেখ করছেন, এই ধরনের সীমান্ত সংঘাত ASEAN-এর নিরাপত্তা কাঠামোর জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। তারা বলেন, দুই দেশের মধ্যে পারস্পরিক বিশ্বাস পুনর্গঠন এবং সীমান্তে পর্যবেক্ষণ মিশন স্থাপন করা জরুরি, যাতে অনিয়ন্ত্রিত গুলিবর্ষণ রোধ করা যায়। এছাড়া, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সমর্থন এবং ত্রিপক্ষীয় আলোচনার মাধ্যমে একটি স্থায়ী সমাধান খুঁজে বের করা প্রয়োজন।
থাইল্যান্ডের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ইতিমধ্যে ক্যাম্বোডিয়ার সঙ্গে উচ্চ পর্যায়ের কূটনৈতিক আলোচনার পরিকল্পনা করেছে। উভয় দেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রী আগামী সপ্তাহে দু’দেশের সীমান্তে একটি যৌথ বৈঠকের আয়োজনের কথা জানিয়েছেন, যেখানে চুক্তির বাস্তবায়ন এবং ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা হবে। এই বৈঠকটি ASEAN-এ নিরাপত্তা সংক্রান্ত আলোচনার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলস্টোন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
অবশেষে, থাইল্যান্ড ও ক্যাম্বোডিয়া উভয়েরই আন্তর্জাতিক শাসনব্যবস্থার প্রতি দায়িত্ব রয়েছে, যাতে সীমান্তে শান্তি বজায় থাকে এবং বেসামরিক জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়। বর্তমান পরিস্থিতি যদি দ্রুত সমাধান না হয়, তবে তা আঞ্চলিক স্থিতিশীলতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে এবং বৃহত্তর ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনার দিকে নিয়ে যেতে পারে।
এই ঘটনার পর, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নজর থাইল্যান্ড ও ক্যাম্বোডিয়ার পরবর্তী পদক্ষেপে থাকবে, বিশেষ করে সীমান্তে পর্যবেক্ষণ মিশনের কার্যকারিতা এবং চুক্তির পুনরায় নিশ্চিতকরণে। উভয় দেশের সরকারকে দ্রুতই স্পষ্ট পদক্ষেপ নিতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে এমন কোনো লঙ্ঘন না ঘটে এবং শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান বজায় থাকে।



