ইলা মিত্র, বাংলা সাহিত্যের অন্যতম অনুবাদক ও সামাজিক কর্মী, ২০০২ সালে মৃত্যুবরণ করেন। তিনি ১৯৪৫ সালে রোমেন মিত্রের সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন এবং ১৯৪৮ সালের মার্চে গোপনে কলকাতায় সন্তান প্রসব করেন। সন্তানকে জন্মের পরই শাশুড়ি গ্রাম রামচণ্ডপুরে নিয়ে গিয়ে তিনি মাঝে মাঝে গোপনে দেখতেন; ১৯৫৪ সালে মুক্তি পেয়ে কলকাতায় ফিরে আসার পর আবার সন্তানকে নিজের সঙ্গে রাখেন।
ইলা মিত্রের শিক্ষাজীবন শুরু হয় যশোরে, তবে বাবার চাকরির কারণে তিনি কলকাতায় বেথুন স্কুল ও কলেজে ভর্তি হন। সেখান থেকে তিনি স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন এবং ১৯৫৭ সালে প্রাইভেট পরীক্ষার মাধ্যমে বাংলা বিষয়ে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন। তার শিক্ষাগত অর্জন তার পরবর্তী অনুবাদ কাজের ভিত্তি গড়ে তুলেছিল।
অনুবাদ ক্ষেত্রে ইলা মিত্রের অবদান বিশাল। ১৯৫৫ সালে শ্যামচরণ দে স্ট্রিটের নবভারতী প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত “জেলখানার চিঠি” বইটি তার অনুবাদে প্রকাশিত হয়। এই গ্রন্থে ছয়টি কবিতা অন্তর্ভুক্ত, মোট পৃষ্ঠাসংখ্যা চুয়াল্লিশ এবং প্রকাশকের নাম সুনীল দাশগুপ্ত। বইটির মূল্য এক টাকা আট আনা এবং পাকিস্তানে চট্টগ্রামের ফিরিঙ্গি বাজার রোডের বইঘরে বিক্রি হতো। এই কাজের পাশাপাশি তিনি “হিরোশিমার মেয়ে”সহ মোট সাতটি বই বাংলা ভাষায় অনুবাদ করেছেন।
ইলা মিত্রের সাহিত্যিক কাজের পাশাপাশি তিনি ক্রীড়া ক্ষেত্রেও সক্রিয় ছিলেন। কৈশোর বয়স থেকে তিনি অ্যাথলেটিক্সে পারদর্শিতা দেখিয়েছেন এবং সাঁতারসহ অন্যান্য খেলাতেও দক্ষতা অর্জন করেন। ১৯৪০ সালে হেলসিঙ্কি অলিম্পিকের জন্য ভারতের প্রতিনিধিত্বের তালিকায় তাঁর নাম উঠে আসে, তবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সূচনার ফলে ঐ অলিম্পিকটি অনুষ্ঠিত হয়নি এবং তিনি অংশ নিতে পারেননি।
রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে ইলা মিত্রের জীবন ও কাজের প্রভাব স্পষ্ট। তিনি ১৯৫৪ সালে ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল থেকে আটক অবস্থায় ছিলেন; প্যারোলের মাধ্যমে কলকাতায় ফিরে এসে তার অনুবাদ কাজ শুরু করেন, যা বাংলা পাঠকদের আন্তর্জাতিক সাহিত্যকে সহজলভ্য করে তুলেছিল। তার অনুবাদকৃত গ্রন্থগুলি বাঙালি সমাজে মানবাধিকার ও ন্যায়বিচারের বিষয়গুলোকে উন্মোচিত করতে সহায়তা করেছে।
ইলা মিত্রের স্বামী রমেন মিত্র ২০০৫ সালে মৃত্যুবরণ করেন, তবে তাদের যৌথ জীবন ও পারিবারিক সংগ্রাম আজও বাঙালি সমাজে স্মরণীয়। তার সন্তান, যাকে গোপনে লালন-পালন করা হয়েছিল, পরবর্তীতে তার সঙ্গে পুনর্মিলিত হয়ে পরিবার গঠন করে। ইলা মিত্রের কাহিনী আজকের তরুণ সমাজের জন্য সাহস, শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক দায়িত্বের উদাহরণ হিসেবে কাজ করে।
ইলা মিত্রের মৃত্যু পর্যন্ত তিনি সক্রিয়ভাবে অনুবাদ ও সামাজিক কাজ চালিয়ে গেছেন। তার অবদান বাংলা ভাষায় আন্তর্জাতিক সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছে এবং ভবিষ্যৎ অনুবাদক ও লেখকদের জন্য পথপ্রদর্শক হয়েছে। তার জীবনকাহিনী বাঙালি জাতির সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে সমৃদ্ধ করার পাশাপাশি সামাজিক ন্যায়বিচার ও মানবিক মূল্যবোধের প্রচারেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।



