আসামের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের আনথাইগওয়ালাও গ্রামে অপরাজিতা নামে পরিচিত নীল ফুলের চাষ সম্প্রতি স্থানীয় কৃষকদের জন্য নতুন আয়ের উৎস হয়ে উঠেছে। নিলাম ব্রাহ্মা, গ্রামবাসী, কয়েক বছর আগে এই লতা-ফুলকে শুধুই সাজসজ্জার গাছ হিসেবে দেখতেন, তবে স্থানীয় নারীরা ফুল বিক্রি করে চা ও নীল রঙ তৈরির মাধ্যমে আয় করছেন জানার পর তিনি নিজেও এই ব্যবসায় ঝাঁপিয়ে পড়েন।
অপরাজিতা একটি লতা রূপে বেড়ে উঠে, উজ্জ্বল নীল রঙের বড় ফুল উৎপন্ন করে, যা চা, পানীয় এবং প্রাকৃতিক রঙের উপাদান হিসেবে ব্যবহার করা যায়। ঐতিহ্যগতভাবে এটি বাড়ির আঙিনায় সাজসজ্জা বা ঔষধি গাছ হিসেবে চাষ করা হতো, তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এর বাণিজ্যিক সম্ভাবনা উন্মোচিত হয়েছে।
প্রায় দুই বছর আগে নিলাম প্রথমবারের মতো শুকনো ফুল বিক্রি করে প্রায় ৫০ ডলার (প্রায় ৩৭ পাউন্ড) আয় করেন। এই অপ্রত্যাশিত মুনাফা তাকে আত্মবিশ্বাস দেয় যে তিনি নিজের ভবিষ্যৎ গড়ে তুলতে পারেন। এরপর তিনি ছোট ঋণ নিয়ে সোলার ড্রায়ার স্থাপন করেন, যা ফুল দ্রুত শুকিয়ে রঙের উজ্জ্বলতা বজায় রাখতে সাহায্য করে এবং ক্রেতাদের নির্ধারিত গুণমান মান পূরণ করে।
সোলার ড্রায়ার ব্যবহারের ফলে উৎপাদন খরচ কমে এবং বাজারে প্রতিযোগিতামূলক মূল্য বজায় থাকে। নিলামের ছোট ব্যবসা এখন স্থানীয় বাজারের পাশাপাশি রপ্তানির সম্ভাবনা অনুসন্ধান করছে, কারণ আন্তর্জাতিক ক্রেতারা প্রাকৃতিক রঙের উপাদান খুঁজে পেতে আগ্রহী।
বিশ্বব্যাপী নীল ফুলের চাহিদা বিশেষত থাইল্যান্ড ও ইন্দোনেশিয়ায় উচ্চ, যেখানে এই গাছের প্রধান উৎপাদক ও ভোক্তা হিসেবে পরিচিত। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় বাজারে প্রাকৃতিক রঙের চাহিদা বাড়ার ফলে ভারতীয় উদ্যোক্তাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে।
প্রাকৃতিক রঙের প্রতি ভোক্তাদের বাড়তি আগ্রহ এবং কৃত্রিম খাবার রঙের উপর কঠোর নিয়ন্ত্রণের ফলে নীল ফুলের রঙের বাজার দ্রুত প্রসারিত হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের ফুড অ্যান্ড ড্রাগ ম্যানেজমেন্ট এজেন্সি (FDA) ২০২১ সালে এই ফুলকে খাদ্য সংযোজক হিসেবে অনুমোদন দেয়, যা রপ্তানি সম্ভাবনা বাড়িয়ে দেয়।
অন্যদিকে, ইউরোপীয় ফুড সেফটি অথরিটি (EFSA) ২০২২ সালে নিরাপত্তা সংক্রান্ত উদ্বেগ প্রকাশ করে, ফলে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও যুক্তরাজ্য এই ফুলকে “নবীন খাবার” (novel food) হিসেবে শ্রেণীবদ্ধ করেছে, যা ব্যাপক ব্যবহারের আগে অতিরিক্ত অনুমোদন প্রয়োজন। এই নিয়মাবলী ভারতীয় উৎপাদকদের জন্য চ্যালেঞ্জ তৈরি করলেও বাজারের সম্ভাবনা অস্বীকার করা যায় না।
ভারতে এখনও অপরাজিতা মূলত বাড়ির আঙিনায় সাজসজ্জা বা ঔষধি গাছ হিসেবে বিবেচিত হয়, এবং এটি বাণিজ্যিক ফসল হিসেবে স্বীকৃত নয়। বাজারে কাঠামোগত তথ্যের অভাব, সরকারি শ্রেণীবিভাগের অনুপস্থিতি এবং স্থির মূল্য নির্ধারণের প্রক্রিয়ার অভাবের ফলে কৃষকরা আয়ের অনিশ্চয়তার মুখে পড়ে।
এই ঘাটতিগুলো সত্ত্বেও ভারতীয় উদ্যোক্তারা বাজারের সম্ভাবনা দেখছেন এবং স্থানীয় উৎপাদন বাড়িয়ে রপ্তানি সম্প্রসারণের পরিকল্পনা করছেন। তারা আশা করছেন যে সরকারী নীতি ও মানদণ্ডের উন্নয়ন হলে উৎপাদনকারী ও রপ্তানিকারকদের জন্য স্থিতিশীল পরিবেশ গড়ে উঠবে।
সারসংক্ষেপে, অপরাজিতা ফুলের চাহিদা আন্তর্জাতিকভাবে বাড়ছে, এবং সোলার ড্রায়ার ও ঋণসহ আধুনিক প্রযুক্তি গ্রহণকারী কৃষকরা স্থানীয়ভাবে আয় বৃদ্ধি পাচ্ছেন। তবে বাজারের কাঠামোগত ঘাটতি ও নিয়ন্ত্রক বাধা দূর করতে সরকারি হস্তক্ষেপ ও মানদণ্ডের প্রয়োজন, যা ভবিষ্যতে এই প্রাকৃতিক রঙের শিল্পকে টেকসই ও লাভজনক করে তুলতে পারে।



