গত সপ্তাহে জার্মানির হ্যামবার্গে অনুষ্ঠিত বার্ষিক Chaos Communication Congress (CCC) সম্মেলনে একটি অপ্রচলিত হ্যাকিং প্রদর্শনী ঘটেছে। হ্যাকটিভিস্ট মার্থা রুট, যিনি নিজের পরিচয় গোপন রেখে কাজ করেন, মঞ্চে উপস্থিত হয়ে তিনটি শ্বেতবর্ণবাদী ওয়েবসাইটের সার্ভার সরাসরি বন্ধ করে দেন। এই কাজটি লাইভ স্ট্রিমের মাধ্যমে দর্শকদের সামনে দেখানো হয় এবং সাইটগুলো এখনো পুনরায় চালু হয়নি।
মার্থা রুট তার উপস্থিতি একটি রঙিন পোশাকের মাধ্যমে চিহ্নিত করেন; তিনি Power Rangers সিরিজের Pink Ranger চরিত্রের পোশাক পরিধান করে মঞ্চে উঠেছিলেন। এই ভিজ্যুয়াল উপস্থাপনা হ্যাকিংয়ের প্রযুক্তিগত দিককে দর্শকদের কাছে আকর্ষণীয় করে তুলেছিল এবং একই সঙ্গে হ্যাকটিভিজমের রাজনৈতিক বার্তা জোরদার করেছিল। মঞ্চে তার বক্তৃতার শেষে তিনি সরাসরি কোড চালিয়ে লক্ষ্যবস্তু সাইটগুলোকে অপ্রবেশযোগ্য করে তোলেন।
মুছে ফেলা তিনটি সাইটের নাম WhiteDate, WhiteChild এবং WhiteDeal। WhiteDate একটি ডেটিং প্ল্যাটফর্ম হিসেবে কাজ করত, যেখানে শ্বেতবর্ণবাদী ব্যবহারকারীরা একে অপরের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করতে পারত। WhiteChild সাইটটি শ্বেতবর্ণবাদী গোষ্ঠীর মধ্যে ডোনার ম্যাচিং সেবা প্রদান করত, অর্থাৎ বংশগত বৈশিষ্ট্য সংরক্ষণে সহায়তা করার জন্য ডিম ও শুক্রাণু দাতাদের তথ্য বিনিময় করত। WhiteDeal একটি শ্রম বাজারের মতো কাজ করত, যেখানে রেসিস্ট্যান্টরা কাজের সুযোগের জন্য একে অপরের সঙ্গে যোগাযোগ করত।
মার্চের শেষের দিকে এই তিনটি সাইটের সার্ভার সম্পূর্ণভাবে বন্ধ হয়ে যায় এবং এখনো কোনো পুনরায় চালু হওয়ার লক্ষণ দেখা যায়নি। সাইটগুলোর প্রশাসকরা তাদের সামাজিক মিডিয়া অ্যাকাউন্টে এই ঘটনার স্বীকৃতি জানিয়ে, হ্যাকটিভিস্টের কাজকে সাইবার সন্ত্রাসবাদ হিসেবে উল্লেখ করেন। তারা উল্লেখ করেন যে, হ্যাকিংয়ের সময় তাদের X (Twitter) অ্যাকাউন্টও অস্থায়ীভাবে মুছে ফেলা হয়, তবে পরে পুনরুদ্ধার করা হয়।
প্রশাসকের পোস্টে তারা হ্যাকটিভিস্টের কাজকে “সার্বজনীনভাবে আমার সব সাইট মুছে ফেলা, যখন দর্শকরা আনন্দে উল্লাস করে” বলে বর্ণনা করেন এবং ভবিষ্যতে প্রতিক্রিয়া জানাবার ইঙ্গিত দেন। একই সঙ্গে তারা হ্যাকটিভিস্টের এই কাজকে সাইবার সন্ত্রাসবাদের একটি উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করে, যা অনলাইন রেডিকালাইজেশনকে লক্ষ্য করে করা হয়েছে।
মার্থা রুটের দাবি অনুযায়ী, তিনি WhiteDate থেকে পাবলিক ডেটা স্ক্র্যাপ করে বিশাল পরিমাণ ব্যবহারকারী তথ্য সংগ্রহ করেন। তিনি উল্লেখ করেন যে, সাইটের নিরাপত্তা ব্যবস্থা এতটাই দুর্বল ছিল যে সাধারণ ব্যবহারকারীরও সহজে ডেটা চুরি করা সম্ভব ছিল। স্ক্র্যাপ করা ছবিগুলোর মেটাডেটা থেকে ব্যবহারকারীর সুনির্দিষ্ট ভৌগোলিক অবস্থান বের করা যায়, যা গোপনীয়তা লঙ্ঘনের একটি স্পষ্ট উদাহরণ।
হ্যাকটিভিস্টের কাজের অংশ হিসেবে তিনি একটি কাস্টম এআই চ্যাটবট ব্যবহার করে সাইটের ব্যবহারকারীদের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করেন এবং তথ্য সংগ্রহের প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করেন। সংগ্রহ করা ডেটা কিছু অংশ অনলাইনে প্রকাশ করা হয়, যাতে শ্বেতবর্ণবাদী গোষ্ঠীর অপারেশনাল দুর্বলতা প্রকাশ পায়। রুটের মতে, এই ধরনের তথ্য প্রকাশ শ্বেতবর্ণবাদী নেটওয়ার্কের নিরাপত্তা সচেতনতা বাড়াতে এবং তাদের কার্যক্রমকে বাধাগ্রস্ত করতে সহায়তা করবে।
এই ঘটনার মাধ্যমে হ্যাকটিভিজমের নতুন দিকটি প্রকাশ পায়, যেখানে প্রযুক্তিগত দক্ষতা এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্য একত্রিত হয়ে অনলাইন উগ্রবাদের বিরুদ্ধে সরাসরি পদক্ষেপ নেওয়া হয়। বিশেষজ্ঞরা উল্লেখ করেন, সাইবার স্পেসে extremist সাইটগুলো প্রায়শই নিরাপত্তা ব্যবস্থায় ঘাটতি থাকে, যা দক্ষ হ্যাকারদের জন্য সহজ লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায়। তবে একই সঙ্গে এই ধরনের সরাসরি হ্যাকিংয়ের নৈতিক ও আইনি দিক নিয়ে বিতর্কও তীব্র হয়।
সাইবার নিরাপত্তা সংস্থা এবং মানবাধিকার সংগঠনগুলো এই ঘটনার পর শ্বেতবর্ণবাদী সাইটগুলোর কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ বাড়ানোর পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে। তারা দাবি করে, অনলাইন উগ্রবাদের বিরুদ্ধে কার্যকরী পদক্ষেপের জন্য প্রযুক্তিগত দুর্বলতা সনাক্তকরণ এবং দ্রুত প্রতিক্রিয়া ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি। ভবিষ্যতে হ্যাকটিভিস্টদের এই ধরনের সরাসরি হস্তক্ষেপের সম্ভাবনা বাড়তে পারে, যা অনলাইন রেডিকালাইজেশনকে দমন করার একটি নতুন কৌশল হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
সামগ্রিকভাবে, হ্যামবার্গের CCC সম্মেলনে মার্থা রুটের এই কার্যক্রম প্রযুক্তি ও সমাজের সংযোগস্থলে একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ উপস্থাপন করে। শ্বেতবর্ণবাদী সাইটগুলোকে সরাসরি বন্ধ করা এবং তাদের ডেটা উন্মোচন করা কেবল প্রযুক্তিগত দক্ষতার প্রদর্শন নয়, বরং অনলাইন উগ্রবাদের বিরুদ্ধে সক্রিয় প্রতিরোধের একটি প্রয়াস। এই ঘটনা ভবিষ্যতে সাইবার নিরাপত্তা নীতি এবং হ্যাকটিভিজমের ভূমিকা নিয়ে নতুন আলোচনার সূচনা করতে পারে।



