২০২৫ সালে বাংলাদেশের রেডি‑মেড গার্মেন্টস (RMG) সেক্টরের রপ্তানি বৃদ্ধির হার মাত্র ০.৮৯ % এ নেমে এসেছে, মোট রপ্তানি $৩৮.৮২ বিলিয়ন রেকর্ড করা হয়েছে। ২০২৪ সালে রপ্তানি $৩৮.৪৮ বিলিয়ন এবং ৭.২৩ % বৃদ্ধি পেয়েছিল, যা দেশের রপ্তানি ইঞ্জিনের ঐতিহ্যবাহী শক্তি নির্দেশ করে। তবে এই বছর রপ্তানির পরিমাণে মাত্র ০.৩৯ % বৃদ্ধি, শিল্পের সামগ্রিক গতি হ্রাসের স্পষ্ট ইঙ্গিত দেয়।
আন্তর্জাতিক বাজারে বাণিজ্যিক উত্তেজনা রপ্তানির ধীরগতির প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রসহ কয়েকটি বড় বাজারে শুল্কের হুমকি ও অর্ডার স্থগিতের ঘোষণা ক্রেতাদের মধ্যে অনিশ্চয়তা বাড়িয়ে দিয়েছে, ফলে অর্ডার দেওয়ার ক্ষেত্রে সতর্কতা দেখা গেছে। কিছু ক্রেতা অস্থায়ীভাবে সরবরাহ চেইন অন্য দেশে স্থানান্তর করেছে, যা বাংলাদেশের গার্মেন্টস শিল্পের দীর্ঘমেয়াদী গ্রাহক সম্পর্ককে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।
বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক নীতি ও অর্ডার স্থগিতের প্রভাব গার্মেন্টস শিল্পের পরিকল্পনা, বিনিয়োগ ও উৎপাদন শিডিউলকে ব্যাহত করেছে। অর্ডার হ্রাসের ফলে নতুন মেশিনারি ও প্রযুক্তি বিনিয়োগে দেরি হয়েছে, যা উৎপাদন ক্ষমতা সম্প্রসারণের সম্ভাবনাকে সীমাবদ্ধ করেছে।
একই সময়ে ভারতীয় ট্রান্সশিপ সুবিধা প্রত্যাহার করা হয়েছে, যা পূর্বে তৃতীয় দেশের রপ্তানির জন্য ব্যবহৃত হতো। এই পরিবর্তনের ফলে রপ্তানি লিড টাইম বৃদ্ধি পেয়েছে, ডেলিভারিতে বিলম্ব ঘটেছে এবং কিছু বিদেশি ক্রেতা বিকল্প সরবরাহকারী খুঁজে নিয়েছে। চট্টগ্রাম বন্দর ও অন্যান্য রুটে অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হওয়ায় লজিস্টিক খরচও বাড়ে।
দেশীয় পর্যায়ে রাজনৈতিক অস্থিরতা ব্যবসায়িক আস্থাকে কমিয়ে দিয়েছে। রাজনৈতিক উত্তেজনা প্রায়শই লজিস্টিক্সে বাধা সৃষ্টি করে, যেমন সড়ক বন্ধ ও কাস্টমস প্রক্রিয়ার বিলম্ব, যা সমগ্র বাণিজ্যিক পরিবেশের দুর্বলতা প্রকাশ করে। এই পরিবেশে স্থানীয় ও বিদেশি উভয় বিনিয়োগকারী সিদ্ধান্ত গ্রহণে দেরি করেছে, ফলে নতুন প্রকল্পের সূচনা স্থগিত হয়েছে।
রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলো কাঁচামাল আমদানি বা উৎপাদন ক্ষমতা বাড়ানোর ক্ষেত্রে আরও সতর্ক হয়ে উঠেছে। কাঁচামালের দাম বৈশ্বিক বাজারে অস্থিরতা, পাশাপাশি লজিস্টিক ব্যয়ের বৃদ্ধি, মূলধন ব্যয়ের ঝুঁকি বাড়িয়ে তুলেছে। ফলে অনেক কোম্পানি সম্প্রসারণ পরিকল্পনা পুনর্বিবেচনা বা স্থগিত করেছে।
শ্রমিকদের প্রতিবাদ ও কর্মসংস্থান সংক্রান্ত অশান্তি ২০২৫ সালে তীব্রতর হয়েছে। রাস্তায় বাধা, কারখানা বন্ধ এবং উৎপাদন ব্যাহত হওয়া সরাসরি উৎপাদন হ্রাসের কারণ হয়েছে, বিশেষ করে গাজীপুর ও সাভার অঞ্চলের বড় গার্মেন্টস পার্কে। এই ধরণের ব্যাঘাত আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের মধ্যে বাংলাদেশের সরবরাহযোগ্যতা সম্পর্কে সন্দেহ বাড়িয়েছে।
উৎপাদন হ্রাসের পাশাপাশি গুণমান ও সময়মতো ডেলিভারির ওপরও নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে, যা দেশের রপ্তানি সুনামকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। গ্লোবাল ব্র্যান্ডগুলো এখন বিকল্প সরবরাহকারী অনুসন্ধানে বেশি সক্রিয়, ফলে বাংলাদেশের বাজার শেয়ার হ্রাসের ঝুঁকি বাড়ছে।
সামগ্রিকভাবে, ২০২৫ সালের রেডি‑মেড গার্মেন্টস সেক্টরকে বহুমুখী ঝুঁকি সম্মুখীন হতে হয়েছে; আন্তর্জাতিক বাণিজ্য নীতি, পার্শ্ববর্তী দেশের লজিস্টিক পরিবর্তন, দেশীয় রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং শ্রমিক অশান্তি একসাথে শিল্পের বৃদ্ধিকে সীমাবদ্ধ করেছে। এই সব কারণ একত্রে রপ্তানি বৃদ্ধির হারকে ১ % এর নিচে নামিয়ে এনেছে।
বিশ্লেষকরা ইঙ্গিত দিচ্ছেন যে, পরবর্তী বছরগুলোতে শুল্ক নীতি ও আন্তর্জাতিক চাহিদার পরিবর্তন, পাশাপাশি দেশীয় রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা রপ্তানি বৃদ্ধির মূল চালিকাশক্তি হবে। তবে শ্রমিকদের সঙ্গে সংলাপ ও লজিস্টিক অবকাঠামো উন্নয়ন না হলে পুনরায় দ্রুত বৃদ্ধি অর্জন কঠিন হতে পারে। নীতি নির্ধারকদের জন্য জরুরি হল শুল্ক ঝুঁকি হ্রাস, ট্রান্সশিপ বিকল্প তৈরি এবং শ্রমিক সমস্যার সমাধানে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ।



