বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার আগারগাঁওতে অবস্থিত মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে সোমবার একে খন্দকার, যিনি মুক্তিযুদ্ধের উপ‑সেনাপতি হিসেবে কাজ করেছেন, তার অবদানের স্মরণে একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। তথ্যচিত্র প্রদর্শনী, সঙ্গীত পরিবেশন ও আলোচনা সেশনের মাধ্যমে তার জীবন ও কর্মের ওপর আলোকপাত করা হয়। উপস্থিত বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গের বক্তব্যে তার দূরদর্শিতা, বিচক্ষণতা ও মানবিক গুণাবলির প্রশংসা করা হয়, পাশাপাশি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য তার আদর্শকে রক্ষার আহ্বান জানানো হয়।
অনুষ্ঠানটি মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের মিলনায়তনে শুরু হয়, যেখানে মহুয়া মঞ্জুরী সুনন্দা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘আছে দুঃখ, আছে মৃত্যু, বিরহদহন লাগে; তবুও শান্তি, তবু আনন্দ, তবু অনন্ত জাগে’ গানের সুরে সবার মনকে স্পর্শ করেন। গানের পর একে খন্দকার ও বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর ওপর ভিত্তি করে নির্মিত তথ্যচিত্রটি বড় পর্দায় প্রদর্শিত হয়, যা তার সামরিক কৌশল ও নেতৃত্বের দিকগুলোকে চিত্রিত করে।
মুক্তিযুদ্ধের অর্থনীতিবিদ ও বিশিষ্ট একাডেমিক অধ্যাপক রেহমান সোবহান অনুষ্ঠানের উদ্বোধনী বক্তব্যে উল্লেখ করেন, মুক্তিযুদ্ধের গৌরবময় কীর্তি স্মরণে একে খন্দকারের নাম অবিচলভাবে উজ্জ্বল থাকবে। তিনি বলেন, একে খন্দকারকে দূরদর্শী, বিচক্ষণ ও মানবিক দৃষ্টিভঙ্গির অধিকারী একজন ব্যক্তি হিসেবে চিরকাল স্মরণ করা হবে।
মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ট্রাস্টি সারওয়ার আলী তার উদ্বোধনী মন্তব্যে বলেন, স্বাধীনতার সংগ্রামে যাঁদের বীরত্বে দেশ গড়ে উঠেছে, তাদের মধ্যে একে খন্দকারের অবদান বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তিনি যোগ করেন, একে খন্দকারের সর্বোচ্চ গুণ ছিল তার সমবেত কাজের পদ্ধতি, যা তাকে সকলের সঙ্গে কাজ করতে সক্ষম করেছিল। আলী আরও উল্লেখ করেন, জাদুঘরের প্রতিষ্ঠা থেকে আজ পর্যন্ত একে খন্দকারের উপস্থিতি অভিভাবকের মতো ছিল এবং তার অবদানের জন্য গভীর শ্রদ্ধা জানানো হচ্ছে।
বীরপ্রতীক আলমগীর সাত্তারও তার বক্তব্যে একে খন্দকারের মুক্তিযুদ্ধে ডেপুটি চিফের পাশাপাশি চিফ কোঅর্ডিনেটর হিসেবে কাজের গুরুত্ব তুলে ধরেন। তিনি বলেন, যুদ্ধ পরিচালনায় একে খন্দকারের দূরদর্শিতা ও বিচক্ষণতা অতুলনীয় ছিল, যা সামরিক কৌশলের সাফল্যের মূল চাবিকাঠি হিসেবে কাজ করেছে।
মুজিবনগর সরকারের প্রাক্তন কর্মকর্তা ও সাবেক সচিব ওয়ালিউল ইসলাম স্মরণে বলেন, অক্টোবরের দিকে যুদ্ধের অবসান দ্রুতই ঘটবে বলে তিনি অনুমান করেছিলেন, কারণ এক কোটি শরণার্থী দীর্ঘ সময় ভারত বহন করতে চায় না। তিনি একে খন্দকারের অনন্য ভূমিকার প্রশংসা করে, তার স্মৃতিকে সম্মান জানাতে আহ্বান জানান।
একে খন্দকারের কন্যা মাতুনা খন্দকার মোস্তফা অনুষ্ঠানে উপস্থিত থেকে তার পিতার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, পিতা দেশের প্রতি গভীর ভালোবাসা ও মানুষের মঙ্গলার্থে কাজ করেছেন, এবং এই স্মরণসভা আয়োজনের জন্য জাদুঘরের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাতে চান।
বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর এয়ার কমোডর হাসান মাহমুদও একে খন্দকারের অবদানকে সম্মান জানিয়ে বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে ঢাকায় বিমানবাহিনীর একটি ঘাঁটি তার নামে নামকরণ করা হয়েছে, যা তার স্মৃতিকে চিরস্থায়ী করবে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, বিমান বাহিনী একে খন্দকারের কৃতিত্বকে সর্বদা স্মরণে রাখবে।
অনুষ্ঠানের সঞ্চালনা জাদুঘরের গ্যালারি গাইড ইয়াসমিন লিসা ও রফিকুল ইসলাম পরিচালনা করেন, যারা উপস্থিত দর্শকদের জন্য তথ্যবহুল ব্যাখ্যা ও সমন্বয় প্রদান করেন। সেশনের শেষে উপস্থিত সকলকে একে খন্দকারের স্মৃতিকে রক্ষা ও তার আদর্শকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়ার গুরুত্বের ওপর জোর দিয়ে বিদায় জানানো হয়।
এই স্মরণসভা শুধুমাত্র একে খন্দকারের ব্যক্তিগত গৌরবকে নয়, মুক্তিযুদ্ধের সামগ্রিক ঐতিহ্যকে পুনরুজ্জীবিত করার একটি প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা হচ্ছে। অংশগ্রহণকারীরা একে খন্দকারের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা সামরিক কৌশল ও মানবিক নীতিগুলোকে দেশের নিরাপত্তা ও উন্নয়নের মডেল হিসেবে গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছেন।
মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের এই উদ্যোগের মাধ্যমে দেশের ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়গুলোকে নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়া এবং স্বাধীনতার মূল্যবোধকে পুনরায় জোরদার করা সম্ভব হয়েছে। ভবিষ্যতে এ ধরনের স্মরণিক অনুষ্ঠানগুলোকে ধারাবাহিকভাবে চালিয়ে যাওয়া, জাতীয় ঐক্য ও আত্মবিশ্বাসকে আরও মজবুত করবে।



