ইরানের রাজধানী তেহরানে ২৮ ডিসেম্বর রবিবার শুরু হওয়া প্রতিবাদে গত সপ্তাহে রাস্তায় বিশাল জনসমাগম দেখা গিয়েছে। মুদ্রা অবমূল্যায়ন, মুদ্রাস্ফীতি এবং অর্থনৈতিক মন্দার বিরোধে নাগরিকরা তীব্র ক্রোধ প্রকাশ করে, আর একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইরানীয় নেতাদের প্রতি সরাসরি সতর্কতা জানিয়ে নিরাপত্তা পরিস্থিতি আরও উত্তেজনাপূর্ণ করে তুলেছেন।
প্রতিবাদ শুরু হওয়ার মাত্র চার-পাঁচ দিন পর ট্রাম্পের অফিসিয়াল বিবৃতি প্রকাশ পায়, যেখানে তিনি ইরানীয় কর্তৃপক্ষকে জানিয়ে দেন যে যুক্তরাষ্ট্র “লকড অ্যান্ড লোডেড” অবস্থায় আছে এবং প্রয়োজন হলে হস্তক্ষেপের প্রস্তুতি রয়েছে। এই সতর্কতা, যা একটি বসন্তের মতো চলমান প্রতিবাদ চলাকালীন সময়ে দেওয়া হয়, ইরানের অভ্যন্তরীণ অশান্তিকে আন্তর্জাতিক মঞ্চে তুলে ধরেছে।
সেই সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ বাহিনী ভেনেজুয়েলায় নিকোলাস মাদুরোর লক্ষ্যবস্তু অপারেশন চালায়, যা ট্রাম্পের দ্বিতীয় সতর্কতার সঙ্গে সমন্বিতভাবে প্রকাশ পায়। দুইটি উচ্চ-প্রোফাইল সতর্কতা একসাথে ইরানের জনগণের মধ্যে সরকারের প্রতি আস্থা হ্রাসের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে।
ইরানীয় নিরাপত্তা বাহিনী প্রতিবাদ শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করে। মানবাধিকার সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত ২০ এরও বেশি নাগরিকের প্রাণহানি ঘটেছে। নিরাপত্তা গোষ্ঠীর হিংসাত্মক দমন, গুলিবিদ্ধ করা এবং গুলিবিদ্ধ না হওয়া প্রতিবাদকারীদের গৃহবন্দী করা ইত্যাদি ঘটনা ধারাবাহিকভাবে রিপোর্ট করা হচ্ছে।
প্রতিবাদের মূল কারণ হিসেবে মুদ্রা অবমূল্যায়ন ও মুদ্রাস্ফীতি উল্লেখ করা হয়। তেহরানের মুদ্রা ডলারের তুলনায় প্রায় ৮০ শতাংশ বেশি অবমূল্যায়িত হয়েছে, যা সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা হ্রাসের প্রধান কারণ। সরকারী তথ্য অনুযায়ী, বার্ষিক মুদ্রাস্ফীতি প্রায় ৪২ শতাংশ, খাবারের দামের বৃদ্ধি ৭০ শতাংশের উপরে, এবং কিছু মৌলিক পণ্যের দাম ১১০ শতাংশের বেশি বেড়েছে। এই আর্থিক চাপের ফলে জনসাধারণের মধ্যে অসন্তোষ বাড়ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের আরোপিত আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা ইরানের অর্থনীতিকে আরও কঠিন করে তুলেছে, তবে এই নিষেধাজ্ঞা একা সব সমস্যার কারণ নয়। দেশের অভ্যন্তরে উচ্চ-প্রোফাইল দুর্নীতির মামলা, বিশেষ করে শীর্ষ কর্মকর্তাদের এবং তাদের পরিবারের সঙ্গে যুক্ত কেলেঙ্কারিগুলি, জনগণের ক্রোধকে তীব্র করে তুলেছে। এই কেলেঙ্কারিগুলি প্রকাশ করে যে শাসনকর্তা বর্গের কিছু অংশ অর্থনৈতিক সংকটকে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করছে।
বহু নাগরিকের মতে, কিছু উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ও তাদের আত্মীয়স্বজন নিষেধাজ্ঞা থেকে সুবিধা নিয়ে বিশেষ চুক্তির মাধ্যমে আমদানি-রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ, তেল আয় বিদেশে স্থানান্তর এবং মানি লন্ডারিং নেটওয়ার্কের মাধ্যমে লাভবান হচ্ছেন। এ ধরনের অভিযোগ সরকারী স্তরে স্বীকৃত হয়েছে, যেখানে কিছু কর্মকর্তাও স্বীকার করেন যে নির্দিষ্ট ব্যক্তিরা নিষেধাজ্ঞা থেকে সরাসরি উপকৃত হচ্ছেন।
প্রতিবাদে অংশগ্রহণকারী নাগরিকদের দাবি স্পষ্ট: অর্থনৈতিক ন্যায়বিচার, মুদ্রা স্থিতিশীলতা এবং দুর্নীতি মুক্ত শাসন। সরকার এই দাবিগুলিকে দমন করার পরিবর্তে, নিরাপত্তা বাহিনীর মাধ্যমে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করে, যা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থার নিন্দা উসকে দিয়েছে।
ট্রাম্পের সম্ভাব্য সামরিক পদক্ষেপের পরিপ্রেক্ষিতে ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক দৃশ্যপট আরও অনিশ্চিত হয়ে দাঁড়িয়েছে। যদি যুক্তরাষ্ট্রের হুমকি বাস্তবায়িত হয়, তবে তা ইরানের নিরাপত্তা কাঠামোকে গভীরভাবে প্রভাবিত করতে পারে এবং বিদ্যমান অশান্তিকে আরও বাড়িয়ে তুলতে পারে। একই সঙ্গে, অভ্যন্তরীণভাবে সরকারকে অর্থনৈতিক সংস্কার ও দুর্নীতি মোকাবেলায় ত্বরান্বিত করতে পারে, নতুবা জনমত আরও তীব্র হয়ে উঠতে পারে।
ইরানের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক দিকনির্দেশনা এখন উভয়ই অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক চাপের মধ্যে নির্ধারিত হবে। যদি নিরাপত্তা বাহিনীর হিংসা অব্যাহত থাকে এবং অর্থনৈতিক অবস্থা উন্নত না হয়, তবে প্রতিবাদ বিস্তৃত হতে পারে এবং সরকারকে রাজনৈতিক সংস্কারের পথে বাধ্য করতে পারে। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি হস্তক্ষেপের সম্ভাবনা ইরানের কূটনৈতিক সম্পর্ককে পুনর্গঠন করতে পারে, যা দেশের অভ্যন্তরীণ নীতি ও আন্তর্জাতিক অবস্থান উভয়কেই প্রভাবিত করবে।
এই পরিস্থিতিতে ইরানের নাগরিক, সরকার এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রত্যেকেরই ভূমিকা স্পষ্ট: অর্থনৈতিক সমস্যার সমাধান, মানবাধিকার রক্ষা এবং কূটনৈতিক সংলাপের মাধ্যমে স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা। বর্তমান অশান্তি কতদূর পর্যন্ত বিস্তৃত হবে এবং কীভাবে সমাধান হবে, তা সময়ের সাথে প্রকাশ পাবে।



