বাংলাদেশের মোট পণ্য রপ্তানি গত বছর প্রায় পাঁচ শতাংশ কমে ৪৭.৭৪ বিলিয়ন ডলার হয়েছে। এই পতনের প্রধান কারণ হিসেবে গ্লোবাল বাজারে পোশাক ও অন্যান্য ভোক্তা পণ্যের চাহিদা হ্রাস উল্লেখ করা হয়েছে। রপ্তানি হ্রাসের সময়কালটি ২০২৫ সালের পুরো অর্থবছরকে অন্তর্ভুক্ত করে।
বিশ্বের সাম্প্রতিক জিও-রাজনৈতিক উত্তেজনা রপ্তানি পরিবেশকে আরও কঠিন করে তুলেছে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের দীর্ঘায়ু, ইসরায়েল ও ফিলিস্তিনের সংঘাত, এবং মধ্যপ্রাচ্যের পাঁচটি দেশের ওপর আক্রমণ আন্তর্জাতিক বাণিজ্য পথকে ব্যাহত করেছে। এই ঘটনাগুলো সরবরাহ শৃঙ্খলে অস্থিরতা সৃষ্টি করে ভোক্তা চাহিদা কমিয়ে দেয়।
বিশেষ করে পোশাক রপ্তানি এই ধাক্কা সবচেয়ে বেশি অনুভব করেছে। চীন, ভারত ও ভিয়েতনামের মতো প্রতিবেশী রপ্তানিকারক দেশগুলিও একই সময়ে তাদের পোশাক রপ্তানিতে হ্রাস দেখেছে। ক্রেতারা অর্ডার কমিয়ে এবং মজুদ কমিয়ে নেওয়ায় এই প্রবণতা গ্লোবাল স্তরে দৃশ্যমান হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের পারস্পরিক শুল্ক নীতি রপ্তানির ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করেছে। ২০২৫ সালের বেশিরভাগ সময়ে উচ্চ শুল্কের সম্ভাবনা থাকায় স্থানীয় রপ্তানিকারকরা এপ্রিল থেকে আগস্টের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত শিপমেন্ট ত্বরান্বিত করে শুল্কের আগে পণ্য রপ্তানির চেষ্টা করেছে। এই ত্বরান্বিত রপ্তানি কৌশলটি স্বল্পমেয়াদে শুল্ক এড়াতে সহায়ক হলেও দীর্ঘমেয়াদে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।
শিপমেন্টের এই অগ্রিম চালনা বিশেষত ক্রিসমাস মৌসুমের গুরুত্বপূর্ণ সময়ে উৎপাদন গতি কমিয়ে দেয়। আগস্ট, সেপ্টেম্বর ও অক্টোবরের মধ্যে পোশাক রপ্তানি, যা দেশের মোট রপ্তানি আয়ের ৮৪ শতাংশের বেশি, স্বাভাবিক গতিতে পৌঁছাতে পারেনি। পশ্চিমা রিটেইলারেরা ইতিমধ্যে বড় মজুদ গড়ে তুলেছে, ফলে নতুন অর্ডারের প্রবাহে সাময়িক স্থবিরতা দেখা দিয়েছে।
শুল্কের ফলে যুক্তরাষ্ট্রের ভোক্তাদের জন্য পণ্যের দামও বাড়ে, যা চাহিদা হ্রাসের আরেকটি কারণ হিসেবে কাজ করে। দাম বাড়ার ফলে আমেরিকান ক্রেতারা কম কেনাকাটা করে, ফলে বাংলাদেশের রপ্তানিকারকদের বিক্রয় চাপ বাড়ে। এই চক্রটি রপ্তানি আয়কে আরও সংকুচিত করে।
এছাড়া, শুল্কের প্রয়োগের ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা তীব্রতর হয়েছে। অন্যান্য রপ্তানিকারক দেশগুলো শুল্কের প্রভাব কমাতে দাম কমিয়ে বা নতুন বাজারে প্রবেশের চেষ্টা করছে, যা বাংলাদেশের রপ্তানিকারকদের জন্য অতিরিক্ত চ্যালেঞ্জ তৈরি করে।
উৎপাদনকারীরা আশা প্রকাশ করেছে যে মজুদ পরিষ্কার হওয়ার পর এবং গ্লোবাল চাহিদা স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসার সঙ্গে সঙ্গে রপ্তানি পুনরুদ্ধার হবে। তারা উল্লেখ করেছে যে, অতিরিক্ত মজুদ হ্রাস পেলে অর্ডার পুনরায় বাড়তে পারে এবং শুল্কের প্রভাবও কমে যাবে। তবে এই পুনরুদ্ধার সময়সীমা নির্ভর করবে আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও ভোক্তা মনোভাবের উপর।
বিশ্লেষকরা সতর্ক করেছেন যে, বর্তমান জিও-রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং শুল্ক নীতি রপ্তানি বাজারে অনিশ্চয়তা বাড়িয়ে তুলছে। যদি মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হয় বা শুল্ক নীতি কঠোর হয়, তবে রপ্তানি পুনরুদ্ধার ধীর হতে পারে। অন্যদিকে, যদি বাণিজ্যিক রুট পুনরায় স্থিতিশীল হয় এবং ভোক্তা চাহিদা পুনরায় বাড়ে, তবে রপ্তানি পুনরায় বৃদ্ধি পেতে পারে।
সারসংক্ষেপে, ২০২৫ সালে বাংলাদেশের পণ্য রপ্তানি গ্লোবাল চাহিদা হ্রাস, শুল্কের চাপ এবং আন্তর্জাতিক অস্থিরতার সমন্বয়ে প্রায় পাঁচ শতাংশ কমে। যদিও রপ্তানি পরিমাণ হ্রাস পেয়েছে, তবে উৎপাদনকারীরা মজুদ পরিষ্কারের পর পুনরুদ্ধারের সম্ভাবনা দেখছেন। ভবিষ্যতে রপ্তানি পুনরুদ্ধার নির্ভর করবে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য পরিবেশের স্থিতিশীলতা এবং শুল্ক নীতির পরিবর্তনের ওপর।
এই পরিস্থিতি দেশের অর্থনীতির জন্য একটি সতর্কবার্তা হিসেবে কাজ করবে, যেখানে রপ্তানি বৈচিত্র্যকরণ এবং নতুন বাজার অনুসন্ধানকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। একই সঙ্গে, সরকার ও শিল্প সংস্থাগুলোর সমন্বিত নীতি প্রণয়ন রপ্তানি প্রতিযোগিতা বাড়াতে এবং শুল্কের প্রভাব কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।
শেষে, রপ্তানির পুনরুদ্ধারকে ত্বরান্বিত করতে উৎপাদনকারীদের উচিত মজুদ ব্যবস্থাপনা উন্নত করা, গুণগত মান বজায় রাখা এবং গ্রাহকের চাহিদা অনুযায়ী পণ্য বৈচিত্র্য বৃদ্ধি করা। এভাবে বাংলাদেশের রপ্তানি খাত দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীলতা অর্জন করতে পারবে।



