বাংলাদেশ সরকার সম্প্রতি জাতীয় সরঞ্জাম শনাক্তকরণ রেজিস্টার (NEIR) চালু করেছে, যা মোবাইল ফোনের অবৈধ ব্যবহার ও চুরি রোধের লক্ষ্য নিয়ে গৃহীত একটি নীতি। এই ব্যবস্থা ১৫ অঙ্কের IMEI নম্বর, SIM‑এর IMSI কোড এবং ফোন নম্বরকে একক ডাটাবেজে সংযুক্ত করে, যাতে নেটওয়ার্কে সংযোগের সময় ডিভাইসের পরিচয় যাচাই করা যায়। সরকার এটিকে নিয়ন্ত্রক সরঞ্জাম হিসেবে উপস্থাপন করেছে, তবে এর সম্ভাব্য নজরদারি ক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন উত্থাপিত হয়েছে।
NEIR-এ প্রতিটি মোবাইল ডিভাইসের অনন্য IMEI, প্রতিটি সিমের IMSI এবং ব্যবহারকারীর নাম নিবন্ধিত থাকে, যা একত্রে একটি ডিজিটাল পরিচয় গঠন করে। যখন কোনো ফোন সেলুলার নেটওয়ার্কে লগইন করে, সিস্টেম স্বয়ংক্রিয়ভাবে এই তথ্যগুলো তুলনা করে নির্ধারণ করে যে ডিভাইসটি অনুমোদিত কিনা। ফলে চুরি হওয়া ফোন বা অবৈধভাবে প্রবেশ করা সিমকে জাতীয় স্তরে ব্লক করা সম্ভব হয়।
এই পদ্ধতি বাজারে ছড়িয়ে থাকা নকল ও চোরাচালান ফোনের সংখ্যা কমাতে সহায়তা করবে বলে আশা করা হচ্ছে। ব্যবহারকারীর দৃষ্টিকোণ থেকে, ডিভাইসের নিরাপত্তা বাড়বে এবং নেটওয়ার্কের গুণগত মান উন্নত হবে। একই সঙ্গে সরকারকে মোবাইল শিল্পের ওপর নিয়ন্ত্রণের সুযোগ দেবে, যা পূর্বে লুকিয়ে থাকা ফাঁকফাঁকি বন্ধ করতে পারে।
তবে, একই বৈশিষ্ট্যই গোপনীয়তা সংক্রান্ত উদ্বেগের মূল কারণ। ডিভাইস, সিম এবং ফোন নম্বরের স্থায়ী সংযোগের মাধ্যমে প্রতিটি ব্যবহারকারীর জন্য একটি শক্তিশালী ডিজিটাল প্রোফাইল তৈরি হয়। যদিও সিস্টেমটি কল শোনানো বা মেসেজ পড়ার ক্ষমতা রাখে না, তবু এটি নির্ধারণ করতে পারে কোন ডিভাইস কোন সিম ব্যবহার করছে এবং কখন নেটওয়ার্কে যুক্ত হচ্ছে।
মোবাইল ফোনগুলি ক্রমাগত সেল টাওয়ারের সঙ্গে যোগাযোগ করে, ফলে অবস্থান তথ্যও স্বয়ংক্রিয়ভাবে রেজিস্টারে সংরক্ষিত হতে পারে। এই তথ্য যদি অন্যান্য সরকারি ডাটাবেজের সঙ্গে মিলিত হয়, তবে ব্যবহারকারীর চলাচল ও যোগাযোগের প্যাটার্ন বিশ্লেষণ করা সম্ভব হতে পারে। তাই, NEIR-কে কেবল নিয়ন্ত্রক টুল নয়, সম্ভাব্য নজরদারি সরঞ্জাম হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
প্রযুক্তি বিশারদরা উল্লেখ করেন, যদি ডেটা শেয়ারিং বা বিশ্লেষণাত্মক সফটওয়্যারের সঙ্গে যুক্ত করা হয়, তবে সরকার বা কোনো তৃতীয় পক্ষের জন্য ব্যক্তিগত তথ্যের ব্যাপক ব্যবহার সহজ হয়ে যাবে। তবে, একই সময়ে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর জন্য অপরাধমূলক তদন্তে এই সিস্টেমটি সহায়ক হতে পারে, যেমন চুরি হওয়া ফোন পুনরুদ্ধার বা সিম হাইজ্যাকিং রোধে।
NEIR-এ সংযুক্ত তথ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য সরকার ডেটা এনক্রিপশন ও অ্যাক্সেস নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা গ্রহণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। তবু, ডেটা লিক বা অভ্যন্তরীণ অপব্যবহারের ঝুঁকি সম্পূর্ণরূপে দূর করা কঠিন বলে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেন।
এই সিস্টেমের কার্যকরীতা মূল্যায়নের জন্য প্রথম পর্যায়ে চুরি হওয়া ফোনের ব্লকিং হার এবং নেটওয়ার্কের গুণগত মানের উন্নতি পর্যবেক্ষণ করা হবে। পাশাপাশি, গোপনীয়তা সংরক্ষণে কীভাবে নিয়মাবলী প্রয়োগ করা হচ্ছে, তা নিয়মিত পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
NEIR চালুর সঙ্গে সঙ্গে সরকার বিভিন্ন সচেতনতা কর্মসূচি চালু করেছে, যাতে ব্যবহারকারীরা ডিভাইস নিবন্ধনের গুরুত্ব ও প্রক্রিয়া সম্পর্কে জানে। এই উদ্যোগের লক্ষ্য হল নিবন্ধন প্রক্রিয়াকে স্বচ্ছ ও সহজ করা, যাতে গ্রাহকরা বাধা ছাড়াই অংশ নিতে পারে।
অধিকন্তু, সরকার ঘোষণা করেছে যে NEIR-এ অন্তর্ভুক্ত তথ্য শুধুমাত্র নির্দিষ্ট আইনগত উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হবে, এবং অপ্রয়োজনীয় নজরদারি নিষিদ্ধ থাকবে। তবে, এই নীতির বাস্তবায়ন কীভাবে হবে, তা এখনও স্পষ্ট নয়।
বাজারে ইতিমধ্যে কিছু মোবাইল বিক্রেতা ও সেবা প্রদানকারী NEIR-এ ডিভাইস রেজিস্ট্রেশন প্রক্রিয়া শুরু করেছে, এবং গ্রাহকদেরকে তাদের IMEI নম্বর প্রদান করতে বলছে। এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন না হলে ডিভাইস নেটওয়ার্কে সংযুক্ত হতে পারবে না, যা ব্যবহারকারীর জন্য নতুন বাধা সৃষ্টি করতে পারে।
সামাজিক দৃষ্টিকোণ থেকে, গৃহস্থালী ও ব্যবসায়িক ব্যবহারকারীরা এই সিস্টেমের ফলে সৃষ্ট সুবিধা ও ঝুঁকি উভয়ই অনুভব করতে পারে। একদিকে, চুরি হওয়া ফোনের দ্রুত ব্লকিং তাদের সম্পদ রক্ষা করবে; অন্যদিকে, ডেটা সংগ্রহের ব্যাপকতা গোপনীয়তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়াবে।
সারসংক্ষেপে, NEIR একটি প্রযুক্তিগত সমাধান হিসেবে মোবাইল বাজারের অশান্তি কমাতে এবং চুরি প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তবে, একই সঙ্গে এটি ব্যবহারকারীর ডিজিটাল পরিচয়কে কেন্দ্রীয়করণ করে, যা ভবিষ্যতে নজরদারি সম্ভাবনা উন্মুক্ত করে। তাই, সিস্টেমের স্বচ্ছতা, ডেটা সুরক্ষা এবং ব্যবহারিক সীমা নির্ধারণে যথাযথ নীতি প্রণয়ন অপরিহার্য।
অবশেষে, NEIR-এর দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব নির্ভর করবে সরকারের নীতি বাস্তবায়ন, প্রযুক্তিগত নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং নাগরিক সমাজের পর্যবেক্ষণের উপর। এই দিকগুলো সমন্বিতভাবে পরিচালিত হলে, সিস্টেমটি দেশের মোবাইল ইকোসিস্টেমকে উন্নত করতে পারে, আর গোপনীয়তা রক্ষার জন্য যথাযথ সুরক্ষা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।



