১ জানুয়ারি শুরু হওয়া নতুন শিক্ষাবর্ষে মাধ্যমিক স্তরের পাঠ্যবইতে জুলাই ১৯৭৫‑এর গণ‑অভ্যুত্থান এবং ১৯৯০‑এর গণ‑অভ্যুত্থান সংক্রান্ত বিষয়বস্তু যুক্ত করা হয়েছে। ষষ্ঠ, সপ্তম, অষ্টম, নবম ও দশম শ্রেণির বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় বইয়ে এই দুই ঐতিহাসিক ঘটনার বিশদ বিবরণ নতুন করে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
একই সঙ্গে পূর্বে প্রকাশিত ইতিহাস‑সংক্রান্ত অংশগুলোর কিছু পরিবর্তনও করা হয়েছে। অধিকাংশ স্থান থেকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধি সরিয়ে দেওয়া হয়েছে, যদিও কিছু অংশে তা রাখা হয়েছে। অষ্টম শ্রেণির সাহিত্য‑কণিকা বই থেকে ‘এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’ শিরোনামের গদ্যটি বাদ দেওয়া হয়েছে; এতে ১৯৭১ সালের ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণ অন্তর্ভুক্ত ছিল। ফলে অষ্টম শ্রেণির গদ্য সংখ্যা এক কমে মোট এগারোটি হয়েছে।
নতুন পাঠ্যবইগুলো বিনামূল্যে শিক্ষার্থীদের হাতে পৌঁছে দেওয়ার জন্য জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) ২১ কোটি ৪৩ লাখের বেশি কপি মুদ্রণ করেছে। এই সংখ্যা মাধ্যমিক স্তর (ইবতেদায়ি সহ) এবং প্রাথমিক স্তর উভয়ই অন্তর্ভুক্ত করে। প্রাথমিক স্তরে মোট ৮ কোটি ৫৯ লাখের বেশি বই মুদ্রণ করা হয়েছে এবং সবগুলোই সরবরাহ করা হয়েছে।
মাধ্যমিক স্তরে বইয়ের সরবরাহ এখনও সম্পূর্ণ হয়নি। এনসিটিবি জানিয়েছে, ৩ জানুয়ারি পর্যন্ত মোট ৭৮.৬৯ শতাংশ বই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পৌঁছে গেছে। বিশেষ করে ষষ্ঠ শ্রেণিতে ৮৫ শতাংশের বেশি বই পৌঁছেছে, সপ্তম শ্রেণিতে ৬৮.৬৯ শতাংশ, অষ্টম শ্রেণিতে প্রায় ৫৫ শতাংশ এবং নবম শ্রেণিতে প্রায় ৮৮ শতাংশ বই সরবরাহ করা হয়েছে। ইবতেদায়ি স্তরে ৯৬ শতাংশের বেশি বই পৌঁছেছে।
এই ঘাটতি মূলত বইয়ের বিতরণে লজিস্টিক চ্যালেঞ্জের কারণে হয়েছে, তবে এনসিটিবি অতিরিক্ত মুদ্রণ চালিয়ে গিয়ে শীঘ্রই বাকি বইগুলো সরবরাহের পরিকল্পনা করেছে। নতুন পাঠ্যবইয়ের বিষয়বস্তুতে জুলাই গণ‑অভ্যুত্থান এবং নব্বইয়ের গণ‑অভ্যুত্থনের কবিতা, প্রবন্ধ, গদ্য ও গ্রাফিক্স যুক্ত করা হয়েছে, যা পূর্বের ২০১২ সালের পুরোনো শিক্ষাক্রমের ভিত্তিতে পুনর্গঠন করা হয়েছে।
গণ‑অভ্যুত্থানের বিষয়বস্তু প্রথমবারের মতো পঞ্চম শ্রেণি থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত বাংলা ও ইংরেজি বিষয়ের বইয়ে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এই পরিবর্তনটি ২০১২ সালে গৃহীত পুরোনো শিক্ষাক্রমের ধারাবাহিকতা হিসেবে করা হয়েছে, যা ছাত্র‑জনতার অভ্যুত্থানের পর সরকার পরিবর্তনের সময় গৃহীত interim সরকার কর্তৃক নতুন শিক্ষাক্রম বাদ দিয়ে পুরোনো কাঠামো পুনরায় চালু করার সিদ্ধান্তের ফল।
নতুন পাঠ্যবইয়ের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা এখন জুলাই ১৯৭৫‑এর সামরিক অভ্যুত্থান, তার পরিণতি এবং ১৯৯০‑এর গণ‑অভ্যুত্থান সম্পর্কে সরাসরি তথ্য পাবে। এতে ঐতিহাসিক ঘটনার পটভূমি, প্রধান ব্যক্তিত্ব, এবং দেশের রাজনৈতিক পরিবর্তনের ধাপগুলো বিশদভাবে উপস্থাপিত হয়েছে।
বইয়ের বিষয়বস্তুতে অতিরিক্ত গ্রাফিক্স ও চিত্র যুক্ত করা হয়েছে, যা শিক্ষার্থীদের বিষয়ের ধারণা সহজে গঠন করতে সহায়তা করবে। বিশেষ করে অষ্টম শ্রেণির গদ্য থেকে বাদ পড়া অংশের পরিবর্তে নতুন প্রবন্ধ ও কবিতা যোগ করা হয়েছে, যাতে ঐতিহাসিক বিশ্লেষণ ও মানবিক দৃষ্টিকোণ উভয়ই তুলে ধরা যায়।
শিক্ষাবর্ষের শুরুতে বইয়ের অল্প সরবরাহের ফলে কিছু বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীরা পুরনো সংস্করণ ব্যবহার করতে বাধ্য হয়েছে। তবে অধিকাংশ বিদ্যালয়ে নতুন বইয়ের ব্যবহার শুরু হয়েছে, এবং শিক্ষকরা নতুন বিষয়বস্তু অনুযায়ী পাঠ পরিকল্পনা তৈরি করছেন।
এনসিটিবি উল্লেখ করেছে, বাকি বইগুলো দ্রুততম সময়ে বিতরণ করা হবে, যাতে সকল শিক্ষার্থী সমানভাবে নতুন পাঠ্যবইয়ের সুবিধা পায়। এছাড়া, প্রাথমিক স্তরে সম্পূর্ণ সরবরাহ নিশ্চিত হওয়ায় ছোট বয়সের শিক্ষার্থীরা নতুন শিক্ষাসামগ্রী দিয়ে শুরু করতে পারবে।
শিক্ষা নীতি বিশেষজ্ঞরা বলেন, ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তগুলোকে পাঠ্যবইয়ে অন্তর্ভুক্ত করা শিক্ষার্থীদের জাতীয় পরিচয় গঠনে সহায়ক। তবে উপাধি ও শিরোনামের পরিবর্তন নিয়ে কিছু মতবিরোধ রয়েছে, যা ভবিষ্যতে আলোচনার বিষয় হতে পারে।
বইয়ের বিষয়বস্তুতে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধি বাদ দেওয়া হয়েছে, তবে কিছু অংশে তা রাখা হয়েছে; এই দ্বৈত পদ্ধতি পাঠ্যবইয়ের সামগ্রিক সঙ্গতি বজায় রাখতে সহায়তা করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
শিক্ষার্থীদের জন্য নতুন বইয়ের ব্যবহার সহজ করতে, বিদ্যালয়গুলোতে তথ্যপ্রযুক্তি সাপোর্ট ও প্রশিক্ষণ সেশন চালু করা হয়েছে। এতে শিক্ষকরা নতুন পাঠ্যবইয়ের কাঠামো ও শিক্ষণ পদ্ধতি সম্পর্কে অবহিত হতে পারবেন।
সামগ্রিকভাবে, নতুন পাঠ্যবইয়ের মুদ্রণ ও বিতরণে অগ্রগতি সত্ত্বেও সম্পূর্ণ সরবরাহে কিছু সময় লাগতে পারে। তবে এনসিটিবি দ্রুত পদক্ষেপ নিয়ে বাকি বইগুলো শীঘ্রই পৌঁছে দেওয়ার পরিকল্পনা করেছে।
শিক্ষার্থীদের জন্য একটি ব্যবহারিক টিপস: নতুন পাঠ্যবইয়ের বিষয়বস্তু আগে থেকেই অনলাইনে ডাউনলোড করে রাখলে, বই না পৌঁছালেও শিক্ষার ধারাবাহিকতা বজায় রাখা সম্ভব। আপনার বিদ্যালয়ের লাইব্রেরি বা শিক্ষকের সঙ্গে যোগাযোগ করে ইলেকট্রনিক কপি পাওয়া যায় কিনা জেনে নিন।



