গণ-অভ্যুত্থানের আগে আওয়ামী লীগের দেড় দশকের শাসনকালে মোট ১,৫৬৯টি গুমের ঘটনা নিশ্চিত হয়েছে গুমসংক্রান্ত তদন্ত কমিশন। এর মধ্যে অন্তত ২৫১ জনের বর্তমান অবস্থান অজানা, তাদের মৃত্যুর সন্দেহ করা হচ্ছে। অতিরিক্তভাবে, গুমের পর নির্দিষ্ট সময়ে ৩৬ জনের দেহ উদ্ধার করা হয়েছে, যাদের মধ্যে বেশিরভাগই ‘ক্রসফায়ার’ শিকার বা নদীতে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় পাওয়া গেছে।
কমিশনের চূড়ান্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, সীমিত সংখ্যক আনুষ্ঠানিক অভিযোগ থেকে সরাসরি গুমের সঙ্গে যুক্ত ২৮৭টি মৃত্যু শনাক্ত করা হয়েছে। এই তথ্যগুলো গত রোববার রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় কমিশন প্রধান, বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরী, এবং অন্যান্য সদস্যদের উপস্থিতিতে অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে উপস্থাপন করা হয়।
প্রতিবেদনে গুমের শিকারদের রাজনৈতিক পরিচয় বিশ্লেষণ করা হয়েছে। মোট গুমের শিকারদের ৯৬.৭ শতাংশ (৯৪৮ জন) রাজনৈতিক সংযুক্তি রাখে। এদের মধ্যে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী থেকে ৪৭৬ জন (৫০.২ শতাংশ), ইসলামী ছাত্রশিবির থেকে ২৩৬ জন (২৪.৯ শতাংশ), বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) থেকে ১৪২ জন (১৫ শতাংশ), জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল থেকে ৪৬ জন (৪.৯ শতাংশ) এবং জাতীয়তাবাদী যুবদল থেকে ১৭ জন (১.৮ শতাংশ) অন্তর্ভুক্ত।
কমিশন উল্লেখ করেছে, গুম ও সংশ্লিষ্ট নির্যাতনগুলো রাজনৈতিকভাবে নিরপেক্ষ নয়; বরং বিরোধী রাজনৈতিক গোষ্ঠীর সদস্যদের ওপর অনুপাতিকভাবে বেশি ঘটেছে। জামায়াতে ইসলামী, ইসলামী ছাত্রশিবির এবং বিএনপির শিকারদের অধিকাংশ উপস্থিতি ইঙ্গিত করে যে এই ঘটনাগুলো কোনো স্বেচ্ছা পদক্ষেপ নয়, বরং নির্দিষ্ট রাজনৈতিক আদর্শকে লক্ষ্য করে পরিকল্পিতভাবে পরিচালিত হয়েছে।
শিকারদের অধিকাংশই ছাত্র ও যুব সংগঠনের সদস্য ছিলেন, যা গুমের পেছনের লক্ষ্যবস্তুকে আরও স্পষ্ট করে। গুমের সময়কাল এবং পদ্ধতি সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য প্রতিবেদনে উল্লেখ না থাকলেও, ‘ক্রসফায়ার’ এবং নদীতে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় দেহ পাওয়া গুমের শিকারদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য।
কমিশনের সদস্যদের মধ্যে বিচারপতি মো. ফরিদ আহমেদ শিবলী, নূর খান লিটন, নাবিলা ইদ্রিস এবং সাজ্জাদ হোসেন অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। তারা গুমের ঘটনাগুলোকে রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করে ভবিষ্যতে দায়িত্বশীলদের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছেন।
প্রতিবেদন জমা দেওয়ার পর সরকারী ও বিরোধী দল উভয়ই এই ফলাফলকে গুরুত্ব দিয়ে দেখার আহ্বান জানিয়েছে। শাসনকালের গুমের সংখ্যা ও রাজনৈতিক সংযুক্তি স্পষ্ট হওয়ায়, সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীলদের ওপর তদন্তের চাপ বাড়বে বলে অনুমান করা হচ্ছে।
গুমসংক্রান্ত তদন্ত কমিশনের চূড়ান্ত প্রতিবেদন এখন সরকারী নথি হিসেবে সংরক্ষিত হয়েছে এবং ভবিষ্যতে আইনি ও মানবাধিকার সংস্থাগুলোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ রেফারেন্স হিসেবে কাজ করবে। গুমের শিকারদের পরিবার ও সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলো এই প্রতিবেদনের ভিত্তিতে পুনরায় অনুসন্ধান ও ন্যায়বিচার চাওয়ার দাবি বাড়িয়ে তুলবে।
গুমের শিকারদের রাজনৈতিক পরিচয় ও গোষ্ঠীভুক্তি স্পষ্ট হওয়ায়, দেশের রাজনৈতিক পরিবেশে গভীর প্রভাব পড়বে বলে বিশ্লেষকরা উল্লেখ করছেন। গুমের ঘটনাগুলোকে উপেক্ষা করা কঠিন হয়ে দাঁড়াবে, এবং ভবিষ্যতে নির্বাচনী প্রক্রিয়া ও মানবাধিকার নীতিমালার পুনর্বিবেচনা প্রয়োজন হতে পারে।
এই প্রতিবেদনের আলোকে, সরকার গুমের শিকারদের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসন পরিকল্পনা প্রস্তুত করার পাশাপাশি, গুমের দায়িত্বশীলদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। তবে, বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় রাজনৈতিক ইচ্ছাশক্তি ও স্বচ্ছতা বজায় রাখা গুরুত্বপূর্ণ হবে।
গুমসংক্রান্ত তদন্ত কমিশনের চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেশের মানবাধিকার রেকর্ডে একটি গুরুত্বপূর্ণ দফা হিসেবে বিবেচিত হবে, এবং আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকগণও এই ফলাফলকে নজরে রাখবে। গুমের শিকারদের সংখ্যা ও রাজনৈতিক সংযুক্তি স্পষ্ট হওয়ায়, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর কাছ থেকে অতিরিক্ত নজরদারি ও সমর্থন প্রত্যাশিত।
সারসংক্ষেপে, গুমসংক্রান্ত তদন্ত কমিশন ১,৫৬৯টি গুমের ঘটনা নিশ্চিত করেছে, যার মধ্যে ২৫১ জন এখনও নিখোঁজ, ৩৬ জনের দেহ উদ্ধার হয়েছে, এবং ২৮৭টি মৃত্যু সরাসরি গুমের সঙ্গে যুক্ত। শিকারদের অধিকাংশই রাজনৈতিক সংযুক্তি রাখে, যা গুমের পেছনের উদ্দেশ্যকে রাজনৈতিকভাবে নিরপেক্ষ নয় বলে নির্দেশ করে। ভবিষ্যতে এই তথ্যের ভিত্তিতে দায়িত্বশীলদের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তা বাড়বে।



