শ্রাবণী মল্লিক, যিনি দেশের অন্যতম অভিজ্ঞ নারী কাবাডি খেলোয়াড়, তার নেতৃত্বে বাংলাদেশ পুলিশ দল প্রথমবারের মতো জাতীয় নারী কাবাডি চ্যাম্পিয়নশিপ জিতেছে। এই জয়টি পূর্বে ধারাবাহিকভাবে বিজয়ী বাংলাদেশ আনসার ও ভি.ডি.পি. দলের আধিপত্যকে শেষ করেছে। টুর্নামেন্টটি দেশের বিভিন্ন বিভাগীয় দলকে একত্রিত করে অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে প্রতিটি দলই শক্তিশালী জাতীয় খেলোয়াড় নিয়ে প্রতিযোগিতা করে।
চ্যাম্পিয়নশিপের সমাপনী ম্যাচে পুলিশ দল উত্তেজনাপূর্ণ খেলা দেখিয়ে শীর্ষে উঠে আসে এবং শেষ স্কোরে প্রতিপক্ষকে পরাজিত করে শিরোপা জয় করে। ম্যাচের শেষ পর্যায়ে শ্রাবণীর কৌশলগত চাল এবং রক্ষণাত্মক দক্ষতা দলকে গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে পৌঁছে দেয়। তার পারফরম্যান্সকে স্বীকৃতি দিয়ে তাকে টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড়ের উপাধি প্রদান করা হয়।
সেরা খেলোয়াড়ের উপাধি পাওয়া নিয়ে শ্রাবণী প্রকাশ করেছেন, কাবাডি খেলা তার জন্য সবসময় আনন্দের উৎস, তবে এই স্বীকৃতি তার আনন্দকে দ্বিগুণ করেছে। তিনি বলেন, পুলিশ দল প্রথমবারের মতো জাতীয় শিরোপা জিতেছে, যা তার ক্যারিয়ারকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে। টুর্নামেন্টের প্রতিযোগিতা তীব্র ছিল; পুলিশ, আনসার, ভি.ডি.পি. এবং বগবের দলগুলোই শক্তিশালী খেলোয়াড় নিয়ে মাঠে নামেছিল।
শ্রাবণীর কাবাডি ক্যারিয়ার ২০১৭ সাল থেকে শুরু হয়, যখন তিনি বাংলাদেশ আনসার ও ভি.ডি.পি. দলের হয়ে খেলতেন। ছয় বছর ধরে তিনি দুইবার চ্যাম্পিয়নশিপ জয়ী দলের অংশ ছিলেন এবং সেই সময়ে দলকে বহুবার শিরোপা এনে দিয়েছেন। আনসার ও ভি.ডি.পি.তে তার সময়কালে তিনি কাবাডির পাশাপাশি অ্যাথলেটিক্স ও কুস্তিতে সক্রিয় ছিলেন।
অ্যাথলেটিক্সে তিনি শট পুটে সাতটি ধারাবাহিক স্বর্ণপদক এবং ৭৬ কেজি ওজনশ্রেণীর কুস্তিতে পাঁচটি স্বর্ণপদক জিতেছেন। এই বহুমুখী সাফল্য তাকে দেশের ক্রীড়া জগতে বিশেষ মর্যাদা এনে দেয়। তবে দীর্ঘ সময়ের পরেও তিনি স্থায়ী চাকরির স্বপ্ন পূরণ করতে পারেননি, যা তাকে নতুন দিক খোঁজার প্রেরণা দেয়।
কয়েকবার স্থায়ী চাকরির জন্য আবেদন করার পরেও ফল না পেয়ে তিনি বাংলাদেশ পুলিশের সঙ্গে যুক্ত হন, যেখানে তিনি চাকরির নিরাপত্তা এবং ভালো বেতন পাওয়ার আশা করেন। পুলিশ সংস্থায় যোগদানের পর তার আর্থিক অবস্থা পূর্বের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নত হয়েছে। তিনি বলেন, এখন তার আয় পূর্বের তুলনায় বেশি, যা তার পরিবার ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার জন্য সহায়ক।
একই সময়ে তিনি একাধিক শাখায় প্রতিযোগিতা চালিয়ে যাওয়ার চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছেন। কাবাডি, অ্যাথলেটিক্স এবং কুস্তি একসাথে প্রশিক্ষণ ও প্রতিযোগিতা করা এখন তার জন্য কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। তিনি ভবিষ্যতে মূলত কাবাডিতে মনোযোগ দিতে চান, তবে পরিস্থিতি কীভাবে পরিবর্তিত হয় তা সময়ই বলে দেবে।
শ্রাবণীর কাবাডি ক্যারিয়ার আন্তর্জাতিক পর্যায়েও উজ্জ্বল। তিনি বাংলাদেশী নারী দলের সঙ্গে এশিয়ান কাবাডি চ্যাম্পিয়নশিপ এবং বিশ্বকাপের ব্রোঞ্জ পদক জয় করেছেন। এই আন্তর্জাতিক সাফল্য তার অভিজ্ঞতা ও নেতৃত্বের গুণকে আরও দৃঢ় করেছে।
জাতীয় স্তরে তার অর্জনগুলো নারী কাবাডির বিকাশে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। প্রথমবারের মতো পুলিশ দল শিরোপা জয় করার মাধ্যমে অন্যান্য বিভাগীয় দলগুলোকে নতুন উদ্যমে কাজ করতে উদ্বুদ্ধ করেছে। তার সাফল্য তরুণ ক্রীড়াবিদদের জন্য অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করবে বলে আশা করা যায়।
বাংলাদেশ কাবাডি সমিতি এই চ্যাম্পিয়নশিপের ফলাফলকে ক্রীড়া উন্নয়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। ভবিষ্যতে নারী কাবাডি দলগুলোকে আরও আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের সুযোগ দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। আসন্ন মাসে জাতীয় দলের প্রস্তুতি শিবির এবং আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টের সূচি নির্ধারিত হয়েছে।
শ্রাবণী মল্লিকের ক্যারিয়ার এবং তার নেতৃত্বে অর্জিত এই শিরোপা দেশের কাবাডি ইতিহাসে একটি স্মরণীয় মুহূর্ত হিসেবে রেকর্ড হবে। তিনি নিজে বলেন, কাবাডি তার জীবনের অপরিহার্য অংশ, এবং এখন তিনি এই খেলাকে আরও উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত। তার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা এবং দলের লক্ষ্য একসাথে মিলিয়ে নারী কাবাডির নতুন সাফল্যের পথে অগ্রসর হওয়া।



