দক্ষিণ লেবাননের সীমান্তের কাছাকাছি জ্মাইজমেহ শহরের নিকটে রবিবার ইসরায়েলি সশস্ত্র বাহিনীর আক্রমণে দুইজনের প্রাণ ত্যাগ হয়েছে। লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, সীমান্ত থেকে প্রায় দশ কিলোমিটার দূরে গাড়ি লক্ষ্য করে চালানো শত্রু শুটিংয়ের ফলে দুজন নাগরিক নিহত হয়েছেন। একই সময়ে ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর একটি বিবৃতি প্রকাশ পায়, যেখানে বলা হয়েছে যে এই হামলা যুদ্ধবিরতি চুক্তির লঙ্ঘনের ধারাবাহিকতায় হিজবুল্লাহর এক সদস্যকে লক্ষ্য করে করা হয়েছে।
ইসরায়েলি পক্ষের দাবি অনুযায়ী, লক্ষ্যবস্তু হিজবুল্লাহর সদস্য হওয়ায় আক্রমণকে বৈধ বলে গণ্য করা হয়েছে, যদিও লেবাননের কর্তৃপক্ষ ঘটনাটিকে নাগরিক ক্ষতির দিকে নির্দেশ করেছে। লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় উল্লেখ করেছে, গুলিবিদ্ধ গাড়ি জ্মাইজমেহের দক্ষিণে অবস্থিত এবং দুইজনের মধ্যে একজন গৃহস্থালী এবং অন্যজন কর্মী ছিলেন।
এই ঘটনার পটভূমিতে রয়েছে গত বছর নভেম্বর ২০২৪-এ কার্যকর হওয়া যুদ্ধবিরতি, যা ইসরায়েল ও হিজবুল্লাহর মধ্যে এক বছরেরও বেশি সময়ের সংঘর্ষের পর স্বাক্ষরিত হয়েছিল। তবে যুদ্ধবিরতি সত্ত্বেও ইসরায়েলি বাহিনী লেবাননের সীমান্তে নিয়মিত আক্রমণ চালিয়ে যাচ্ছে, যা আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের উদ্বেগের কারণ। যুক্তরাষ্ট্রের তীব্র চাপ এবং ইসরায়েলি বড় পরিসরের অভিযানের সম্ভাবনা নিয়ে লেবাননের সরকার হিজবুল্লাহকে নিরস্ত্র করার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেছে।
লেবাননের সরকার ও সেনাবাহিনীর পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৫ সালের শেষ নাগাদ লিতানি নদীর দক্ষিণে, সীমান্ত থেকে প্রায় ত্রিশ কিলোমিটার বিস্তৃত অঞ্চলে হিজবুল্লাহর উপস্থিতি সম্পূর্ণভাবে দূর করা হবে। এই লক্ষ্য অর্জনের জন্য লেবাননের মন্ত্রিসভার একটি বৈঠক বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত হবে, যেখানে নিরাপত্তা নীতি ও সীমান্ত রক্ষার কৌশল নিয়ে আলোচনা হবে। একই সঙ্গে, যুদ্ধবিরতি পর্যবেক্ষণ কমিটি—যার সদস্য দেশগুলোর মধ্যে লেবানন, ইসরায়েল, যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স এবং জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা বাহিনী—এই সপ্তাহের শেষের দিকে একটি সভা নির্ধারণ করেছে।
ইসরায়েলের পররাষ্ট্রমন্ত্রী গিদিওন সার সামাজিক মাধ্যমে একটি পোস্টে উল্লেখ করেছেন, লেবাননের সরকার ও সেনাবাহিনী হিজবুল্লাহ নিরস্ত্রের জন্য কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে, তবে তা “পর্যাপ্ত নয়” বলে তিনি মন্তব্য করেছেন। তিনি ইরানের সমর্থনে হিজবুল্লাহ পুনরায় অস্ত্র সংগ্রহ ও সামরিক ক্ষমতা পুনর্গঠন করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে বলে অভিযোগ করেন।
একজন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক উল্লেখ করেছেন, লেবাননের এই পদক্ষেপগুলো ইসরায়েলি নিরাপত্তা উদ্বেগের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ, তবে হিজবুল্লাহর পুনরায় অস্ত্রায়ন লেবাননের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক জটিলতা বাড়িয়ে তুলতে পারে। তিনি আরও যোগ করেন, “যদি লেবানন হিজবুল্লাহকে সম্পূর্ণভাবে নিরস্ত্র করতে না পারে, তবে ইসরায়েলি আক্রমণ বাড়তে পারে, যা পুরো অঞ্চলের স্থিতিশীলতাকে হুমকির মুখে ফেলবে।”
ইসরায়েল পূর্বে লেবাননের সেনাবাহিনীর সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে এবং হিজবুল্লাহ গোপনে অস্ত্র মজুদ করছে বলে অভিযোগ করেছে। তবে হিজবুল্লাহ ধারাবাহিকভাবে অস্ত্র সমর্পণের আহ্বান প্রত্যাখ্যান করেছে এবং তাদের অস্ত্র সংগ্রহের অধিকারকে জাতীয় প্রতিরক্ষার অংশ হিসেবে রক্ষা করেছে।
এই ঘটনার আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটকে বিবেচনা করলে দেখা যায়, মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য সংঘর্ষের তুলনায় লেবাননের পরিস্থিতি এখনও জটিল। সিরিয়ার গৃহযুদ্ধের পরবর্তী পর্যায়ে গৃহযুদ্ধের শিকারদের পুনর্বাসন ও সীমানা নিরাপত্তা সমস্যাগুলি লেবাননে পুনরাবৃত্তি হচ্ছে। একই সঙ্গে, ইসরায়েল ও হিজবুল্লাহর মধ্যে চলমান উত্তেজনা গাজা, সোরিয়ার মতো অন্যান্য থিয়েটারে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে।
লেবাননের সরকার ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জন্য এখন গুরুত্বপূর্ণ হল, যুদ্ধবিরতি পর্যবেক্ষণ কমিটির সুপারিশ অনুসারে হিজবুল্লাহকে ধীরে ধীরে নিরস্ত্র করা এবং একই সঙ্গে লেবাননের সীমানা রক্ষার জন্য নিরাপত্তা কাঠামোকে শক্তিশালী করা। এই প্রক্রিয়ার সাফল্য নির্ভর করবে লেবাননের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ঐক্য, যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক চাপ এবং ইসরায়েলের নিরাপত্তা উদ্বেগের সমন্বয়ে।
সারসংক্ষেপে, দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলি আক্রমণে দুইজনের মৃত্যু ঘটেছে, যা ইতিমধ্যে স্থগিত যুদ্ধবিরতির লঙ্ঘন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। লেবাননের সরকার হিজবুল্লাহ নিরস্ত্রের জন্য নতুন পদক্ষেপ নেবে বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, তবে ইসরায়েলি পক্ষের মতে এই পদক্ষেপগুলো এখনও অপর্যাপ্ত। ভবিষ্যতে লেবাননের সেনাবাহিনীর পরিকল্পনা, আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণ কমিটির কার্যক্রম এবং কূটনৈতিক আলোচনার ফলাফলই এই উত্তেজনা কমাতে মূল ভূমিকা রাখবে।



