22 C
Dhaka
Thursday, January 29, 2026
Google search engine
Homeঅপরাধমব জাস্টিসের উত্থান ও আইনের শাসনের ঝুঁকি: ৫ আগস্টের পরের পরিস্থিতি

মব জাস্টিসের উত্থান ও আইনের শাসনের ঝুঁকি: ৫ আগস্টের পরের পরিস্থিতি

ঢাকা, ৭ জানুয়ারি ২০২৬ – ৫ আগস্ট ২০২৪-এ ছাত্র-জনতার প্রতিবাদে সৃষ্ট অশান্তির পর থেকে দেশে মব জাস্টিসের ঘটনা বৃদ্ধি পেয়েছে। বিভিন্ন শহরে ভিড়ের হাতে লিনচিং, গৃহহত্যা এবং সম্পত্তি নষ্টের ঘটনা রেকর্ড করা হয়েছে, যা নাগরিক নিরাপত্তা ও আইনের শাসনের ওপর গুরুতর হুমকি সৃষ্টি করেছে।

পূর্বে রাষ্ট্রের নিরাপত্তা বাহিনীর প্রতি জনগণের ভয় ছিল, কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে উন্মত্ত ভিড়ের প্রতি ভয় বাড়ছে। অতীতের পরিকল্পিত ও কাঠামোগত অপরাধের তুলনায় আজকের অপরাধগুলো বিশৃঙ্খল ও তাৎক্ষণিক, ফলে নাগরিকের জীবনের নিরাপত্তা প্রায় বিলুপ্তপ্রায় অবস্থায় পৌঁছেছে।

আইনের শাসন একটি আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের মূল স্তম্ভ, তবে যখন বিচারব্যবস্থা কেবল শক্তিশালী ও প্রভাবশালীদের রক্ষাকবচে পরিণত হয়, তখন মব জাস্টিসের মতো ভয়াবহ দানবের জন্ম হয়। সমাজবিজ্ঞানী গাস্টাভ লে বনের “দ্য ক্রাউড: এ স্টাডি অব দ্য পপুলার মাইন্ড” গ্রন্থে তিনি উল্লেখ করেছেন যে, উন্মত্ত ভিড়ের কোনো স্বতন্ত্র চিন্তা থাকে না; ব্যক্তিগত বিবেক ও বিচারবোধ সামষ্টিক উন্মাদনায় হারিয়ে যায়।

বাংলাদেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে এই মবিউক্রেসি বা উশৃঙ্খল জনতার শাসন আইনের শাসনের ওপর চরম হুমকি তৈরি করেছে। ৫ আগস্টের ছাত্র-জনতার বিপ্লবের পর, ফ্যাসিস্ট স্বৈরশাসনের অবসান ঘটলেও, রাস্তায় মব জাস্টিস নতুন এক মহামারির মতো ছড়িয়ে পড়েছে। এটি শুধুমাত্র অপরাধের বিচার নয়, বরং রাষ্ট্রের সক্ষমতা ও শাসনের ওপর বড় প্রশ্ন উত্থাপন করে।

লিনচিং শব্দের উৎপত্তি নিয়ে ঐতিহাসিক মতভেদ থাকলেও সর্বাধিক স্বীকৃত তথ্য অনুযায়ী, এটি আমেরিকার গৃহযুদ্ধের পর ভার্জিনিয়ার কর্নেল চার্লস লিনচের নাম থেকে এসেছে। তৎকালীন সময়ে কোনো আইনগত প্রক্রিয়া ছাড়াই বিদ্রোহী বা অপরাধীদের তাৎক্ষণিক শাস্তি দেওয়ার প্রথা “লিনচ ল” নামে পরিচিত হয়। ১৯শ শতাব্দীতে শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্ববাদীরা কৃষ্ণাঙ্গদের ওপর যে নিষ্ঠুরতা চালিয়েছিল, তা লিনচিংয়ের সবচেয়ে কলঙ্কিত অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত। মধ্যযুগীয় ইউরোপের ডাইনি শিকারের থেকে বর্তমান দক্ষিণ এশিয়ার গরু চোর বা সন্দেহভাজন ছেলেদের পিটিয়ে হত্যা পর্যন্ত, সবই একই মনস্তাত্ত্বিক ভিত্তিতে গড়ে উঠেছে।

যখন রাষ্ট্র তার নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয় এবং বিচারহীনতার সংস্কৃতি গড়ে ওঠে, তখনই মানুষ আইন নিজের হাতে নিতে বাধ্য হয়। দেশের বিভিন্ন জেলা প্রশাসক ও পুলিশ প্রধানের মতে, মব জাস্টিসের ঘটনা নিয়ন্ত্রণে তৎপরতা বাড়াতে বিশেষ দিকনির্দেশনা তৈরি করা হয়েছে। বর্তমানে তদন্তকারী সংস্থা ঘটনাস্থল থেকে প্রমাণ সংগ্রহ, সাক্ষী বিবৃতি এবং ভিডিও রেকর্ডের ভিত্তিতে অপরাধীদের শনাক্ত করার চেষ্টা করছে।

আইনি দৃষ্টিকোণ থেকে লিনচিং অপরাধের শাস্তি কঠোরভাবে নির্ধারিত। দণ্ডবিধি অনুযায়ী, সরাসরি হিংসা, হত্যা বা শারীরিক আঘাতের ক্ষেত্রে অপরাধীর বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ড, আজীবন কারাদণ্ড বা দীর্ঘমেয়াদী কারাদণ্ড আরোপ করা হতে পারে। তবে বাস্তবে প্রমাণের অভাব, ভিড়ের গোপনীয়তা এবং সামাজিক চাপের কারণে অনেক ক্ষেত্রে দায়িত্বশীলদের বিচার করা কঠিন হয়ে দাঁড়ায়।

অধিকন্তু, মানবাধিকার সংস্থা ও আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা মব জাস্টিসের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপের আহ্বান জানিয়ে সরকারকে জনসচেতনতা বৃদ্ধি, আইনি শিক্ষা এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থার উন্নয়নে ত্বরান্বিত করার পরামর্শ দিচ্ছেন। তারা উল্লেখ করেন যে, ভিড়ের উন্মাদনা কমাতে সামাজিক নেটওয়ার্কে মিথ্যা তথ্যের বিস্তার রোধ এবং দ্রুত সঠিক তথ্য প্রদান অপরিহার্য।

সরকারের পক্ষ থেকে প্রকাশিত বিবৃতিতে বলা হয়েছে, মব জাস্টিসের বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতা নীতি বজায় থাকবে এবং সংশ্লিষ্ট সকল অপরাধীকে কঠোর আইনি শাস্তি দেওয়া হবে। একই সঙ্গে, পুলিশ ও স্থানীয় প্রশাসনকে জনসাধারণের সঙ্গে সমন্বয় করে দ্রুত প্রতিক্রিয়া ব্যবস্থা গড়ে তোলার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেন, মব জাস্টিসের উত্থান শুধুমাত্র অপরাধের ফল নয়, বরং রাষ্ট্রের দুর্বলতা, বিচারব্যবস্থার অকার্যকারিতা এবং সামাজিক অস্থিরতার সমন্বয়। তাই দীর্ঘমেয়াদে এই সমস্যার সমাধান করতে হলে আইনগত কাঠামোকে শক্তিশালী করা, স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং নাগরিকদের মৌলিক অধিকার রক্ষার জন্য কার্যকর নীতি প্রণয়ন করা জরুরি।

মব জাস্টিসের বিস্তার রোধে সরকার, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা এবং সমাজের সকল স্তরের সমন্বিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন। বর্তমান পরিস্থিতি যদি যথাযথভাবে মোকাবিলা না করা হয়, তবে আইনের শাসন ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের ওপর দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতি হতে পারে।

এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে, সংশ্লিষ্ট আদালত ও তদন্ত সংস্থার পরবর্তী পদক্ষেপের অপেক্ষা করা হচ্ছে, যাতে অপরাধের দায়ী ব্যক্তিদের দ্রুত বিচার করা যায় এবং সমাজে আইনের প্রতি আস্থা পুনর্স্থাপন করা যায়।

৮০/১০০ ১টি সোর্স থেকে যাচাইকৃত।
আমরা ছাড়াও প্রকাশ করেছে: ইত্তেফাক
অপরাধ প্রতিবেদক
অপরাধ প্রতিবেদক
AI-powered অপরাধ content writer managed by NewsForge
RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments