চট্টগ্রাম জেলার লোহাগাড়া উপজেলায় অবস্থিত তেলিবিলা গ্রাম থেকে ৪২ বছর বয়সী আবুল হাশেমের জীবনের মোড় ঘুরে দাঁড়িয়েছে। ২০০৫ সালে তিনি সৌদি আরবে কর্মসংস্থানের সন্ধানে পা বাড়িয়ে ব্যবসা শুরু করেন এবং ধীরে ধীরে সফলতা অর্জন করেন।
সৌদিতে হাশেমের দুইটি দোকান মক্কা শহরে পরিচালিত হতো, যা তার প্রধান আয়ের উৎস ছিল। এই ব্যবসা থেকে প্রাপ্ত আয় দিয়ে তিনি দুই একর জমি ক্রয় করেন এবং নিজস্ব পাকা বাড়ি নির্মাণ করেন।
২০২১ সালে হাশেমের পাকস্থলীতে ক্যানসার ধরা পড়ে, ফলে তিনি তৎক্ষণাৎ বাংলাদেশে ফিরে আসেন। দীর্ঘমেয়াদী চিকিৎসার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যয় তার সঞ্চয় সম্পূর্ণ নিঃশেষ করে দেয়। রোগের তীব্রতা সত্ত্বেও তিনি চিকিৎসা চালিয়ে যান এবং শেষ পর্যন্ত সুস্থ হয়ে ওঠেন।
চিকিৎসা শেষের পর হাশেমের শারীরিক অবস্থা স্থিতিশীল, এবং তিনি পুনরায় কাজের সন্ধান করেন। নিজের জমিতে তিনি শীতকালীন মিশ্র সবজি চাষ শুরু করেন, যেখানে শিম, সরিষা, কাঁচা মরিচ এবং মৌমাছি পালনের জন্য হাইভ স্থাপন করা হয়েছে।
দুই একর জমিতে তিনি ধারাবাহিকভাবে শীতকালীন সবজি উৎপাদন করেন এবং কৃষি কর্মকর্তাদের পরামর্শ অনুসারে ফসলের বৈচিত্র্য বাড়িয়ে তোলেন। ফসলের বিক্রয় থেকে খরচ বাদে তার বার্ষিক আয় প্রায় তিন লক্ষ টাকা হয়, যা তার পরিবারের আর্থিক স্বাবলম্বনকে শক্তিশালী করে।
ফসলের পাশাপাশি হাশেম তার বাড়ির পাশে একটি ছোট মুদিদোকান চালু করেছেন, যেখানে তিনি নিজের উৎপাদিত সবজি ও ফল বিক্রি করেন। এই উদ্যোগটি স্থানীয় গ্রাহকদের সরাসরি তাজা পণ্য সরবরাহের পাশাপাশি তার আয় বাড়াতে সহায়তা করে।
ভবিষ্যতে তিনি জমির পরিধি বাড়িয়ে বড় মাপের মিশ্র সবজি ও ফলের বাগান গড়ে তোলার পরিকল্পনা করছেন। তবে টঙ্কাবতী নদীর শুষ্ক মৌসুমে পানির অভাব তার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। upstream-এ অবস্থিত রাবার ড্যামের কারণে নদীর প্রবাহ কমে যায়, ফলে সেচের জন্য পর্যাপ্ত পানি পাওয়া কঠিন হয়।
হাশেমের মতে, উপজেলা প্রশাসনের সক্রিয় হস্তক্ষেপে এই সমস্যার সমাধান সম্ভব হবে। তিনি স্থানীয় কর্তৃপক্ষকে অনুরোধ করেন যে, ড্যাম পরিচালনা ও নদীর পানির প্রবাহ নিয়ন্ত্রণে নজরদারি বাড়ানো হোক, যাতে কৃষিকাজে প্রয়োজনীয় সেচের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা যায়।
কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা হাশেমকে আধুনিক চাষাবাদ পদ্ধতি, সেচ প্রযুক্তি এবং বাজার সংযোগের বিষয়ে পরামর্শ প্রদান করছেন। এই সহায়তা তার উৎপাদনশীলতা বাড়াতে এবং আয় বৃদ্ধি করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
আজ হাশেম নিয়মিতভাবে তার ফসলের যত্ন নেন, মৌমাছি পালনের কাজ করেন এবং বাজারে পণ্য বিক্রি করেন। তিনি বলেন, ক্যানসার মোকাবেলা করার পর তিনি জীবনের নতুন দিক আবিষ্কার করেছেন এবং স্বাস্থ্যের গুরুত্ব আরও উপলব্ধি করেছেন।
দীর্ঘমেয়াদে তিনি নিজেকে বড় কৃষি উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তুলতে চান, যাতে স্থানীয় যুবকদের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয় এবং গ্রামীণ অর্থনীতিতে অবদান রাখা যায়। তার গল্প ক্যানসার রোগী ও কৃষকদের জন্য পুনর্নবীকরণ এবং আত্মনির্ভরতার উদাহরণ হিসেবে কাজ করছে।



