দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট লি জে মিউং ২০২৬ সালের প্রথম সপ্তাহে বেইজিংয়ে শি জিনপিংয়ের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠক করেন, যা দুই দেশের সম্পর্ক পুনরায় গড়ে তোলার লক্ষ্যে নেওয়া হয়েছে। লি সোমবার চীনের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে নিরাপত্তা, বাণিজ্য এবং কোরিয়ান পপ সংস্কৃতির ওপর নিষেধাজ্ঞা সহ বেশ কয়েকটি বিষয় আলোচনা করবেন। এই সফরটি নভেম্বর মাসে শি জিনপিং দক্ষিণ কোরিয়ায় ভ্রমণ করার পরের দ্বিতীয় শীর্ষ সম্মেলন, এবং ২০১৯ সালের পর প্রথম কোরিয়ান রাষ্ট্রপ্রধানের চীন সফর।
লি বেইজিংয়ে পৌঁছানোর পর শি জিনপিংয়ের আয়োজিত ভোজে অংশ নেন, এরপর চীনের প্রধানমন্ত্রী লি চিয়াং এবং জাতীয় সংসদের চেয়ারম্যান ঝাও লেজি সঙ্গে সাক্ষাৎ করবেন। ভোজের পর লি শাংহাইয়ে গিয়ে অতিরিক্ত আলোচনায় অংশ নেবেন। সফরের সময় লি কোরিয়ান সম্প্রদায়ের সামনে বলেন, এই ভ্রমণটি কোরিয়া-চীন সম্পর্কের ফাঁক পূরণ, স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনা এবং নতুন স্তরে উন্নীত করার নতুন সূচনা হবে।
বিশেষজ্ঞরা উল্লেখ করেন, চীন দক্ষিণ কোরিয়ার সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক অংশীদার হওয়ায় লি এই সফরে চীনের সঙ্গে অর্থনৈতিক সহযোগিতা বজায় রাখার পাশাপাশি রাজনৈতিক উত্তেজনা বাড়লে সম্পর্ককে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার না করার নিশ্চয়তা চান। সাম্প্রতিক সময়ে চীন ও জাপান টাইওয়ানের স্বায়ত্তশাসন নিয়ে তীব্র কূটনৈতিক বিরোধে লিপ্ত, যা কোরিয়ার জন্য কূটনৈতিক দিক থেকে জটিল পরিস্থিতি তৈরি করেছে।
জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানাই তাকাইচি পার্লামেন্টে টাইওয়ানকে চীনের আক্রমণ থেকে রক্ষা করার জন্য স্বয়ংসম্পূর্ণ প্রতিরক্ষা বাহিনী গঠন করার সম্ভাবনা উত্থাপন করেন, ফলে বেইজিং টাইওয়ান বিষয়ক রেটোরিক্স তীব্রতর করে। দক্ষিণ কোরিয়া যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র, যা টাইওয়ানকে সমর্থন করে এবং তার প্রতিরক্ষার জন্য অস্ত্র সরবরাহ করে। তাই লি শি জিনপিংয়ের সঙ্গে বৈঠকে এই সংবেদনশীল বিষয়গুলোও আলোচনার সূচিতে রয়েছে।
লি জে মিউংয়ের পূর্বসূরি, ইম্পিচড প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট ইউন সুক ইয়োল, চীনের প্রতি কঠোর অবস্থান নেন এবং তার শাসনামলে দুই দেশের সম্পর্ক খারাপ হয়ে গিয়েছিল। লি এখন চীনের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার পাশাপাশি উভয় দেশের ঐতিহাসিক বন্ধনকে ব্যবহার করে পারস্পরিক সুবিধা বাড়ানোর চেষ্টা করছেন।
চীনের দিক থেকে শি জিনপিংয়ের এই বৈঠকের প্রতি আগ্রহের পেছনে আঞ্চলিক মিত্রের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। ইয়ংইন বিশ্ববিদ্যালয়ের চীন গবেষণার অধ্যাপক পার্ক সিউং-চান জানান, চীন স্পষ্টভাবে দক্ষিণ কোরিয়াকে তার সঙ্গে সমন্বয় করতে এবং জাপানকে সমালোচনা করতে চায়। এই চাহিদা লি জে মিউংয়ের জন্য কূটনৈতিক ভারসাম্য রক্ষার নতুন চ্যালেঞ্জ উপস্থাপন করে।
বৈঠকের সময় নিরাপত্তা বিষয়ক আলোচনায় উভয় পক্ষই এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে কীভাবে সহযোগিতা করা যায় তা নিয়ে মত বিনিময় করেন। চীনের কোরিয়ান পপ সংস্কৃতির ওপর অনানুষ্ঠানিক নিষেধাজ্ঞা, যা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কোরিয়ান সঙ্গীত ও নাটকের ওপর প্রভাব ফেলেছে, তা সমাধানের জন্যও আলোচনা হবে বলে জানা যায়।
বৈঠকের পর লি শাংহাইয়ে অতিরিক্ত বৈঠক চালিয়ে দক্ষিণ কোরিয়া ও চীনের বাণিজ্যিক সম্পর্কের গভীরতা বাড়ানোর পরিকল্পনা প্রকাশ করেন। উভয় দেশই পারস্পরিক বাণিজ্যিক সুবিধা বাড়াতে, বিশেষ করে উচ্চ প্রযুক্তি, অটোমোবাইল এবং শক্তি সেক্টরে সহযোগিতা বাড়ানোর লক্ষ্য রাখে।
এই সফরটি কোরিয়া-চীন সম্পর্কের নতুন অধ্যায়ের সূচনা হতে পারে, তবে একই সঙ্গে দক্ষিণ কোরিয়াকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তার নিরাপত্তা চুক্তি বজায় রেখে চীনের সঙ্গে সমন্বয় বজায় রাখতে হবে। ভবিষ্যতে কোরিয়া-চীন-জাপান ত্রিপক্ষীয় সম্পর্কের গতিপথ কী হবে, তা লি জে মিউংয়ের এই ভ্রমণের ফলাফলের ওপর নির্ভরশীল।
সারসংক্ষেপে, লি জে মিউংয়ের বেইজিং সফর কোরিয়া-চীন সম্পর্কের পুনরায় গঠন, আঞ্চলিক নিরাপত্তা বিষয়ক সমন্বয় এবং বাণিজ্যিক সহযোগিতা বাড়ানোর লক্ষ্যে পরিকল্পিত। শি জিনপিংয়ের সঙ্গে এই বৈঠক উভয় দেশের কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থের সমন্বয়কে পরীক্ষা করবে, এবং দক্ষিণ কোরিয়ার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পার্টনারশিপ বজায় রেখে চীনের সঙ্গে সমঝোতা রক্ষার নতুন কৌশল গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ হবে।



