শীতের তীব্রতা শেষ বছরের শেষ সপ্তাহ থেকে বাড়তে থাকে এবং নতুন বছরের প্রথম চার দিনেও একই রকম ঠাণ্ডা বজায় রয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে শীতজনিত রোগের সংখ্যা বাড়ছে, বিশেষত শিশুরা সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত হচ্ছে। বিভিন্ন হাসপাতালের বহির্বিভাগে নবজাতক ও ছোট বয়সী রোগীর সংখ্যা লক্ষণীয়ভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে; তাদের বেশিরভাগই সর্দি, জ্বর, কাশি, ডায়রিয়া, শ্বাসকষ্ট এবং নিউমোনিয়ার মতো শীতজনিত সমস্যায় ভুগছে।
বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় বহির্বিভাগে মোট ৯৬৩ শিশুকে বিভিন্ন রোগের জন্য চিকিৎসা প্রদান করা হয়েছে। এদের মধ্যে জরুরি বিভাগে ২৪২ শিশু, মেডিসিন বিভাগে ৬১৩ এবং সার্জারি বিভাগে ১০৮ রোগী সেবা পেয়েছেন। একই সময়ে ১১৫ নবজাতককে ভর্তি করা হয়েছে। বহির্বিভাগে ৪২ নবজাতক চিকিৎসা নিয়েছেন, যার মধ্যে ১৮টি কেসে ভর্তি করা হয়েছে।
নিউমোনিয়া রোগে আক্রান্ত শিশুদের সংখ্যা বিশেষভাবে উদ্বেগজনক। গত রবিবার বহির্বিভাগে নিউমোনিয়া নিয়ে ৩৩টি কেস রিপোর্ট হয়েছে, যার মধ্যে ৯টি গুরুতর অবস্থায় ভর্তি করা হয়েছে। সাধারণ সর্দি নিয়ে আসা শিশুর সংখ্যা ১৬৮, আর অ্যাজমা রোগে আক্রান্ত শিশু ২৮টি কেসে দেখা গেছে। ত্বকের সমস্যার ক্ষেত্রে স্ক্রাবিস রোগে ১৬৯ এবং অন্যান্য ত্বকের রোগে ২০৩টি কেস রেকর্ড হয়েছে, আর ডায়রিয়া নিয়ে আসা শিশুর সংখ্যা ২৯।
একজন চার বছরের শিশুর মা, নাজমা আক্তার, জানান যে তার সন্তান রাতে লেপ-কম্বলের বাইরে বের হয়ে থাকায় ঠাণ্ডা লেগে গিয়েছিল। কয়েক দিন পর নাক দিয়ে পানি পড়া এবং জ্বর দেখা দেয়, ফলে তিনি শিশুটিকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে গেছেন। চিকিৎসকরা উল্লেখ করেন যে বর্তমানে বহির্বিভাগে অধিকাংশ শিশু জ্বর, সর্দি, কাশি, নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া এবং চর্মরোগের জন্য আসছে। প্রতিদিন শতাধিক শিশুকে ভর্তি করা হচ্ছে, তবে শয্যা সংকটের কারণে কিছু রোগীকে বাড়ি ফেরত পাঠাতে হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা অভিভাবকদের সতর্ক করছেন যে শীতকালে শিশুরা সহজে ঠাণ্ডা পেতে পারে, তাই বাড়িতে যথাযথ গরম কাপড়, স্যান্ডেল এবং লেপ-কম্বল ব্যবহার করা জরুরি। তারা উল্লেখ করেন যে শীতের সময় জ্বর, কাশি, নিউমোনিয়া, ব্রংকাইটিস এবং শীতকালীন ডায়রিয়ার ঘটনা স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের রেসপিরেটরি মেডিসিন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. মো. কামরুজ্জামান জানান, শীতের এই সময়ে কমন কোল্ড এবং ব্রংকিওলাইটিসের রোগী সংখ্যা বাড়ছে, যা শ্বাসযন্ত্রের সংক্রমণ এবং শ্বাসকষ্টের দিকে নিয়ে যায়। তিনি আরও উল্লেখ করেন যে দ্রুত সনাক্তকরণ ও উপযুক্ত চিকিৎসা রোগের গুরত্বপূর্ণতা কমাতে সহায়ক।
শিশু রোগীর সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে হাসপাতালের শয্যা সংকট বাড়ছে; ফলে কিছু রোগীকে ত্বরিতভাবে বাড়ি ফেরত পাঠানো হচ্ছে। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় হাসপাতাল ও স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষকে অতিরিক্ত শয্যা ব্যবস্থা এবং জরুরি সেবা সম্প্রসারণের প্রয়োজন।
অভিভাবকদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল শিশুকে শীতের প্রভাব থেকে রক্ষা করা। ঘরে তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ, যথাযথ পোশাক এবং সঠিক পুষ্টি নিশ্চিত করা রোগের ঝুঁকি কমাতে পারে। এছাড়া, কোনো শ্বাসজনিত উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
শীতের এই কঠিন সময়ে, স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারীরা এবং পরিবার একসাথে কাজ করে শিশুর স্বাস্থ্য রক্ষা করতে পারবে। আপনি কি আপনার শিশুর শীতকালীন সুরক্ষা নিয়ে কোনো বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করছেন? আপনার মতামত শেয়ার করুন।



