প্রতি বছর দেশের শ্রমবাজারে লক্ষ লক্ষ নতুন স্নাতক যোগ দিচ্ছেন। পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ ও পলিটেকনিক থেকে হাজারো ডিগ্রি ধারক বেরিয়ে আসলেও, অনেক তরুণের জন্য স্নাতকোত্তর জীবনের প্রথম ধাপ বেকারত্ব বা আংশিক কর্মসংস্থানের মুখোমুখি হওয়া। এই অবস্থা কেবল চাকরির অভাব নয়, বরং শিক্ষাব্যবস্থার এমন একটি গঠনগত সমস্যার ফল, যেখানে শংসাপত্রের চেয়ে দক্ষতার মূল্যায়ন কমে যায়।
দশকের বেশি সময় ধরে দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সংখ্যা বাড়ছে; একশেরও বেশি পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়, পাশাপাশি হাজারো কলেজ ও টেকনিক্যাল ইনস্টিটিউট স্নাতক উৎপাদন করছে। তবে এই বিশাল উৎপাদন সত্ত্বেও, কর্মসংস্থানের বাজারে দক্ষ কর্মীর ঘাটতি স্পষ্ট।
যুব বেকারত্বের হার এখনো দেশের গঠনমূলক সংকটের একটি প্রধান সূচক। সমস্যাটি প্রতিভার অভাব নয়, বরং শিক্ষার পদ্ধতিতে রয়েছে। স্নাতকোত্তর হওয়া মানেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে কর্মক্ষমতা অর্জন হয় না; বরং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো যে পদ্ধতিতে জ্ঞান প্রদান করে, সেটি কর্মক্ষেত্রের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থা বিশ্বের অন্যতম বিচ্ছিন্ন কাঠামো। বাংলা মাধ্যম, ইংরেজি মাধ্যম, মাদ্রাসা, কোয়োমি মাদ্রাসা, এবতেদায়ী, টেকনিক্যাল ও ভোকেশনাল স্ট্রিম সবই একসাথে বিদ্যমান, তবে সমন্বয়ের অভাব স্পষ্ট। একে অপরের সঙ্গে সংযুক্ত না হওয়ায় শিক্ষার্থীরা একই স্তরে সমান মানের দক্ষতা অর্জন করতে পারে না।
নীতিনির্ধারকরা প্রায়ই রাজনৈতিক মতাদর্শ বা স্বল্পমেয়াদী লক্ষ্য অনুসারে নীতি পরিবর্তন করেন। ফলে শিক্ষার গুণগত মানে ধারাবাহিকতা বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়ে, এবং ফলস্বরূপ শিক্ষার্থীর ফলাফলেও বৈষম্য দেখা যায়।
এই বৈষম্যের ফলে স্নাতকরা ‘সমমান’ শংসাপত্র পায়, তবে তাদের দক্ষতা ও সক্ষমতা ব্যাপকভাবে ভিন্ন হয়। নিয়োগকর্তারা প্রায়ই গ্র্যাজুয়েটদের দক্ষতা নিয়ে অনিশ্চিত থাকেন, ফলে চাকরির প্রক্রিয়ায় অতিরিক্ত প্রশিক্ষণ বা সময় ব্যয় করতে হয়।
শিক্ষা ব্যবস্থার মূল সমস্যাগুলোর একটি হল বইয়ের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা। প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের মুখস্থ করার ওপর জোর দেওয়া হয়, যেখানে সমালোচনামূলক চিন্তা, স্পষ্ট যোগাযোগ বা জ্ঞান প্রয়োগের ক্ষমতা কমে যায়।
ফলস্বরূপ, অনেক স্নাতক পরীক্ষায় ভাল ফলাফল করলেও কর্মস্থলে মৌলিক কাজ—যেমন পেশাদার ইমেইল লেখা, উপস্থাপনা তৈরি, সমস্যার বিশ্লেষণ বা দলগত কাজ—সম্পাদনে সমস্যার সম্মুখীন হন। এই দক্ষতার ঘাটতি সরাসরি উৎপাদনশীলতা ও ক্যারিয়ার অগ্রগতিতে বাধা সৃষ্টি করে।
শিক্ষকের গুণমানের ওপরও একই রকম প্রভাব পড়ে। বেতন কম, প্রশিক্ষণের সুযোগ সীমিত, দায়িত্বশীলতা দুর্বল এবং রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের কারণে শিক্ষক পেশার মর্যাদা হ্রাস পাচ্ছে। ফলে শিক্ষার্থীর শেখার মানও প্রভাবিত হচ্ছে।
শিল্পক্ষেত্রের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা যায়, অনেক কোম্পানি দক্ষ কর্মী খুঁজে পেতে কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি। কিছু পদ দীর্ঘ সময়ের জন্য শূন্য থাকে, যদিও আবেদনকারী সংখ্যা বেশি। এই পার্থক্যই দেশের অর্থনৈতিক বৃদ্ধিকে বাধাগ্রস্ত করে।
একটি সাম্প্রতিক সমীক্ষা অনুযায়ী, নিয়োগকর্তাদের ৭০% উল্লেখ করেছেন যে নতুন স্নাতকরা প্রায়ই ব্যবহারিক দক্ষতার অভাবে ভুগছেন। অন্যদিকে, বহু তরুণ স্নাতক তাদের প্রশিক্ষণ ক্ষেত্রের বাইরে অপ্রাসঙ্গিক কাজ করতে বাধ্য হন, যা তাদের ক্যারিয়ার গঠনে বাধা সৃষ্টি করে।
এই বাস্তবতা বিবেচনা করে, স্নাতক শিক্ষার্থীদের জন্য অতিরিক্ত প্রশিক্ষণ ও অভিজ্ঞতা অর্জন করা জরুরি। ইন্টার্নশিপ, অনলাইন কোর্স, দক্ষতা উন্নয়ন কর্মশালা এবং স্বেচ্ছাসেবী প্রকল্পে অংশগ্রহণ তাদের কর্মক্ষমতা বাড়াতে পারে। আপনার ক্যারিয়ার পরিকল্পনায় কোন ধরনের দক্ষতা যোগ করতে চান, তা নিয়ে ভাবা কি আপনার পরবর্তী পদক্ষেপের জন্য সহায়ক হবে?



