চিফ প্রোসিকিউটর তাজুল ইসলাম আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল‑১-এ জানিয়েছেন, নরায়ণগঞ্জে সাতজনের দেহ শীতালক্ষ্যা নদীতে ভাসে যাওয়ার পর র্যাবের প্রাক্তন কর্মকর্তা জিয়াউল আহসান দেহ গোপন করার পদ্ধতি পরিবর্তন করেন।
২০১৪ সালে নরায়ণগঞ্জে একাধিক রাজনৈতিক কর্মীর নিধন ঘটার পর তাদের দেহ নদীতে ভাসে যাওয়া জনসাধারণের বিস্তৃত নিন্দা সৃষ্টি করে। ঐ ঘটনার পর তদন্তে প্রকাশ পায়, দেহগুলোকে সহজে পানির পৃষ্ঠে না ওঠাতে নতুন পদ্ধতি গৃহীত হয়।
তাজুলের মতে, জিয়াউল আহসান দেহের ওজনের সমান ইটের টুকরা দেহের সঙ্গে বেঁধে নদীতে ফেলা নির্দেশ দেন, যাতে দেহের উপরে ভাসে না ওঠে। এই নির্দেশনা দেহের পুনরাবিষ্কারের সম্ভাবনা কমিয়ে দেয় বলে তিনি উল্লেখ করেন।
এই তথ্যের সূত্র হিসেবে প্রোসিকিউশন এক গোপনীয়তা ভঙ্গের শিকার ব্যক্তির বর্ণনা ব্যবহার করেছে। তিনি জানান, টাস্ক ফোর্স ফর ইন্টাররোগেশন (টিএফআই) সেলের এক গার্ড গোপনভাবে এই আদেশের কথা প্রকাশ করেছেন। গার্ডটি এক নিঃশব্দ রাতে গোপনীয়তা ভঙ্গের ভয় থেকে এই কথা বলার সাহস পেয়েছিলেন।
গার্ডের কথায় উল্লেখ আছে, শিকারের ওজন নির্ধারণের জন্য তাকে আটক হওয়ার এক সপ্তাহ পর মাপা হয়। এরপর দেহের সঙ্গে ওজনের সমান ইট যুক্ত করে নদীতে ফেলা হয়। শিকার ব্যক্তি কেবল তখনই বেঁচে ছিলেন, যখন জিয়াউল আহসানকে অন্য দায়িত্বে স্থানান্তর করা হয়।
এই সাক্ষ্যটি আইসিটি‑১-এ জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে চার্জ‑ফ্রেমিং শোনানির সময় উপস্থাপিত হয়। প্রোসিকিউশন দাবি করে, জিয়াউল আহসান ১৯৯৬‑২০১৪ সময়কালে আওয়ামী লীগ শাসনকালে ১০০‑এরও বেশি মানুষকে নিখোঁজ করা, অতিরিক্ত শাস্তি প্রদান এবং গৃহহত্যা সহ মানবাধিকার লঙ্ঘনের দায়িত্বে ছিলেন।
প্রোসিকিউশন তিনটি অপরাধের ভিত্তিতে জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনাল) আইন, ১৯৭৩ অনুসারে অভিযোগ দায়ের করেছে। এতে হত্যাকাণ্ড, অপহরণ, যন্ত্রণা, নিখোঁজ করা এবং অন্যান্য অমানবিক কাজের অভিযোগ অন্তর্ভুক্ত।
তাজুলের মতে, প্রমাণের পরিমাণ যথেষ্ট এবং প্রাথমিক পর্যায়ে মামলাটি চালু করার জন্য যথাযথ ভিত্তি রয়েছে। তিনি আদালতকে চার্জ‑ফ্রেমিং অনুমোদনের অনুরোধ করেন, যাতে মামলাটি আনুষ্ঠানিকভাবে এগিয়ে যায়।
জিয়াউল আহসান র্যাবের বিভিন্ন গোয়েন্দা ও অপারেশনাল পদে কাজ করেছেন। প্রোসিকিউশন দাবি করে, তিনি কেবল কমান্ডার হিসেবেই নয়, সরাসরি দেহ গোপন করার কাজেও অংশ নেন। তার এই পদক্ষেপগুলোকে মানবাধিকার লঙ্ঘনের গুরুতর উদাহরণ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে।
আইসিটি‑১-এ শোনানির পরবর্তী ধাপ হবে বিচারিক প্রক্রিয়ার শুরু, যেখানে প্রতিরক্ষা দল তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের সত্যতা চ্যালেঞ্জ করতে পারবে। আদালত যদি চার্জ‑ফ্রেমিং অনুমোদন করে, তবে জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে বিচারের সময়সূচি নির্ধারিত হবে।
এই মামলাটি দেশের মানবাধিকার রেকর্ডে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। জনসাধারণের নিন্দা ও আন্তর্জাতিক নজরদারির মধ্যে, আইসিটি‑১-এ ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা দেশের আইনি স্বচ্ছতা ও দায়িত্বশীলতা বৃদ্ধিতে সহায়তা করবে।



