মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ভেনেজুয়েলা দেশের বিশাল তেল সংরক্ষণে প্রবেশের ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের তেল কোম্পানিগুলোকে ভেনেজুয়েলার তেল অবকাঠামো পুনর্নির্মাণে বিনিয়োগের আহ্বান জানিয়ে, দেশকে অর্থনৈতিকভাবে পুনরুজ্জীবিত করার লক্ষ্য উল্লেখ করেন। এই পরিকল্পনা কীভাবে বাস্তবায়িত হবে এবং তার সম্ভাব্য বাধাগুলো কী, তা নিয়ে বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
ভেনেজুয়েলা প্রায় ৩০৩ বিলিয়ন ব্যারেল তেল সংরক্ষণে বিশ্বের সর্ববৃহৎ রিজার্ভের অধিকারী। তবে বর্তমান উৎপাদন মাত্র কয়েক শত হাজার ব্যারেল দৈনিক, যা এই বিশাল সম্পদের তুলনায় নগণ্য। ২০০০-এর দশকের শুরুর দিকে উৎপাদন শীর্ষে ছিল, কিন্তু হুগো চাভেজ ও নিকোলাস মাদুরো শাসনের সময় রাষ্ট্রীয় তেল সংস্থা পিডিভিএসএ-তে কঠোর নিয়ন্ত্রণের ফলে অভিজ্ঞ কর্মী বহিষ্কৃত হয়ে উৎপাদন হ্রাস পায়।
মার্কিন শেল কোম্পানি সহ কিছু পশ্চিমা তেল সংস্থা এখনও ভেনেজুয়েলায় কাজ করে, তবে যুক্তরাষ্ট্রের আরোপিত নিষেধাজ্ঞার ফলে তাদের কার্যক্রম উল্লেখযোগ্যভাবে সংকুচিত হয়েছে। ২০১৫ সালে বারাক ওবামা প্রশাসন মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে প্রথম নিষেধাজ্ঞা আরোপের পর থেকে, তেল রপ্তানি ও বিদেশি বিনিয়োগে কঠোর সীমাবদ্ধতা বজায় রয়েছে। এই নিষেধাজ্ঞা ভেনেজুয়েলার তেল শিল্পকে প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ ও মূলধন থেকে বঞ্চিত করেছে।
ট্রাম্পের পরিকল্পনা অনুসারে, আমেরিকান তেল কোম্পানিগুলোকে ভেনেজুয়েলার পুরনো তেল ক্ষেত্র ও পাইপলাইন সংস্কারে বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করতে হবে। তিনি দাবি করেন, এই বিনিয়োগের মাধ্যমে অবকাঠামোর অবনতি দূর হয়ে দেশটি তেল উৎপাদন বাড়াতে পারবে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা করতে সক্ষম হবে। তবে এই উদ্যোগের জন্য প্রয়োজনীয় মূলধন ও প্রযুক্তি সরবরাহে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক ইচ্ছা ও অর্থনৈতিক সক্ষমতা প্রশ্নবিদ্ধ।
বিশেষজ্ঞরা ট্রাম্পের পরিকল্পনার সামনে বহু বাধা উল্লেখ করেছেন। বিনিয়োগের মোট খরচ বিলিয়ন ডলারের অতিক্রম করবে এবং তেল উৎপাদন বাড়াতে দশকেরও বেশি সময় লাগতে পারে। তদুপরি, ভেনেজুয়েলার তেল অবকাঠামো পুরনো ও ক্ষতিগ্রস্ত, যা পুনর্নির্মাণে উচ্চ প্রযুক্তি ও বিশেষজ্ঞ কর্মী প্রয়োজন। একটি বিশ্লেষক উল্লেখ করেছেন, অবকাঠামোই প্রধান বাধা, এবং তা মেরামত না করা পর্যন্ত উৎপাদন বাড়ানো কঠিন।
আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, নভেম্বর মাসে ভেনেজুয়েলা দৈনিক প্রায় ৮৬০,০০০ ব্যারেল তেল উৎপাদন করেছে, যা দশ বছর আগে উৎপাদনের এক তৃতীয়াংশেরও কম। এই পরিমাণ বিশ্ব তেল চাহিদার এক শতাংশেরও কম, ফলে ভেনেজুয়েলার তেল বাজারে প্রভাব সীমিত। তাছাড়া, নিষেধাজ্ঞা ও রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা ঝুঁকি কমাতে চায়, ফলে প্রকৃতপক্ষে বড় পরিমাণ মূলধন প্রবাহিত হওয়া কঠিন।
ট্রাম্পের পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে, যুক্তরাষ্ট্রের তেল কোম্পানিগুলোকে ভেনেজুয়েলার রাজনৈতিক পরিবেশে কাজ করতে হবে, যেখানে সরকারী নীতি ও নিয়মাবলী প্রায়শই পরিবর্তনশীল। তদুপরি, ভেনেজুয়েলার সরকারী তেল সংস্থা পিডিভিএসএ-র সঙ্গে চুক্তি ও শেয়ারহোল্ডার কাঠামো পুনর্গঠন করা প্রয়োজন হবে, যা সময়সাপেক্ষ ও জটিল প্রক্রিয়া।
রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে, ট্রাম্পের এই উদ্যোগ ভেনেজুয়েলার অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করার পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের তেল স্বার্থ রক্ষার লক্ষ্যে গৃহীত হতে পারে। তবে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মধ্যে এই পরিকল্পনা নিয়ে মতবিরোধ রয়েছে; কিছু দেশ নিষেধাজ্ঞা শিথিলের পক্ষে, আবার অন্যরা মানবাধিকার ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার ওপর জোর দেয়।
সারসংক্ষেপে, ভেনেজুয়েলার বিশাল তেল রিজার্ভের সম্ভাবনা সত্ত্বেও, বর্তমান উৎপাদন ক্ষমতা, অবকাঠামোর অবনতি, আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা এবং রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ট্রাম্পের পরিকল্পনাকে জটিল করে তুলেছে। যুক্তরাষ্ট্রের তেল কোম্পানিগুলোকে বড় মূলধন ও দীর্ঘমেয়াদী প্রতিশ্রুতি দিতে হবে, এবং তা বাস্তবায়নে দশকেরও বেশি সময় লাগতে পারে। ভবিষ্যতে এই উদ্যোগের অগ্রগতি নির্ভর করবে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক ইচ্ছা, ভেনেজুয়েলার অভ্যন্তরীণ সংস্কার এবং আন্তর্জাতিক বাজারের চাহিদার ওপর।



