৪ জানুয়ারি রবিবার রাশিয়া টুডে-তে এক সাক্ষাৎকারে সিটি ইউনিভার্সিটি অব নিউইয়র্কের লাতিন আমেরিকান স্টাডিজের অধ্যাপক ড্যানিয়েল শ উল্লেখ করেছেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি ভেনেজুয়েলায় দীর্ঘমেয়াদি শাসন প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করে, তবে তা ভিয়েতনাম বা ইরাকের মতো দীর্ঘস্থায়ী প্রতিরোধের দিকে নিয়ে যেতে পারে। তিনি এই মন্তব্যের পটভূমি হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের এক অনন্য অভিযানকে উল্লেখ করেছেন, যেখানে প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে অপহরণ করা হয় এবং দেশটির রাজনৈতিক পরিবেশে অস্থিরতা সৃষ্টি হয়।
ড্যানিয়েল শের মতে, মাদুরোর অপহরণে সৃষ্ট অস্থিরতা এবং যুক্তরাষ্ট্রের শাসন প্রতিষ্ঠার কোনো প্রচেষ্টা তীব্র বিরোধের জন্ম দেবে। তিনি সতর্ক করেছেন, এমন কোনো প্রচেষ্টা দ্রুতই ব্যাপক প্রতিবাদ এবং সংগঠিত প্রতিরোধের রূপ নিতে পারে, যা সময়ের সাথে সাথে দীর্ঘস্থায়ী গৃহযুদ্ধের রূপ নিতে পারে।
অধিকন্তু, তিনি ভিয়েতনাম ও ইরাকের যুদ্ধের উদাহরণ তুলে ধরেছেন, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি সামরিক হস্তক্ষেপের ফলে বিশাল মানবিক ক্ষতি, ব্যয়বহুল খরচ এবং স্পষ্ট কোনো সাফল্য অর্জিত হয়নি। এই দুই যুদ্ধের অভিজ্ঞতা ভেনেজুয়েলায় একই ধরনের হস্তক্ষেপের সম্ভাব্য পরিণতি সম্পর্কে সতর্কতা প্রদান করে।
প্রফেসর শ উল্লেখ করেন, নিকোলাস মাদুরোর অ্যান্টি‑ইম্পেরিয়ালিস্ট অবস্থান এবং তিন দশকের চাভিসমো নীতি, যা প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট হুগো শাভেজের সমাজতান্ত্রিক নীতির উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে, ভেনেজুয়েলীয় জনগণকে রাজনৈতিকভাবে সচেতন ও সংগঠিত করেছে। এই ঐতিহাসিক পটভূমি দেশের নাগরিকদের মধ্যে বিদেশি শাসনকে অগ্রহণযোগ্য করে তুলেছে।
এই বাস্তবতা থেকে স্পষ্ট যে, ভেনেজুয়েলীয় জনগণ কোনো বিদেশি দখলকে স্বীকার করবে না এবং যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি শাসন প্রচেষ্টা তাদের মধ্যে ব্যাপক বিরোধের সঞ্চার করবে। ড্যানিয়েল শ এই পরিস্থিতিকে ডেভিড ও গলিয়াথের তুলনায় উপস্থাপন করে, যেখানে ছোট ও দুর্বল পক্ষের প্রতিরোধ বৃহৎ শক্তির বিরুদ্ধে অপ্রত্যাশিতভাবে সফল হতে পারে।
প্রফেসর আরও বলেন, রাশিয়া বা অন্যান্য আঞ্চলিক শক্তির ঐক্যবদ্ধ অবস্থান, অথবা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নিন্দা একা এই গতিপথ পরিবর্তন করতে সক্ষম নয়। তিনি ইঙ্গিত করেন, ভেনেজুয়েলায় যুক্তরাষ্ট্রের শাসন প্রতিষ্ঠা যদি বাস্তবায়িত হয়, তবে তা কেবল সামরিক শক্তি নয়, স্থানীয় জনগণের দৃঢ় ইচ্ছাশক্তি ও রাজনৈতিক ঐতিহ্যের মুখোমুখি হবে।
এই প্রসঙ্গে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মন্তব্যও আলোচনার কেন্দ্রে এসেছে। ট্রাম্প দাবি করেছেন, মাদুরোর গ্রেপ্তারির পর যুক্তরাষ্ট্র সাময়িকভাবে ভেনেজুয়েলার প্রশাসন গ্রহণ করবে। এই ঘোষণার প্রতি ক্যারাকাসের সরকার এবং জনগণের তীব্র প্রতিক্রিয়া প্রকাশ পেয়েছে, যা দেশের অভ্যন্তরে যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপের প্রতি বিরোধের মাত্রা বাড়িয়ে দিয়েছে।
ভিয়েতনাম ও ইরাকের যুদ্ধের ইতিহাসে দেখা যায়, দীর্ঘস্থায়ী বিদেশি হস্তক্ষেপের ফলে হাজার হাজার সৈন্যের প্রাণহানি, বিশাল আর্থিক ব্যয় এবং শেষ পর্যন্ত কোনো স্পষ্ট কৌশলগত লক্ষ্য অর্জিত হয়নি। ড্যানিয়েল শের বিশ্লেষণ এই দৃষ্টিকোণ থেকে যুক্তরাষ্ট্রের ভেনেজুয়েলা নীতি পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানায়।
যদি যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘমেয়াদি শাসন বজায় রাখার চেষ্টা চালিয়ে যায়, তবে ভেনেজুয়েলা সম্ভবত একটি দীর্ঘস্থায়ী গৃহযুদ্ধের মুখোমুখি হতে পারে, যা শুধু দেশের নয়, পুরো লাতিন আমেরিকান অঞ্চলের নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাকে প্রভাবিত করবে।
প্রফেসরের সতর্কবার্তা ইঙ্গিত করে যে, অতীতের ব্যর্থ হস্তক্ষেপের শিক্ষা উপেক্ষা করলে একই ধরনের মানবিক ও আর্থিক ক্ষতি পুনরাবৃত্তি হতে পারে। তাই, ভেনেজুয়েলায় যুক্তরাষ্ট্রের নীতি নির্ধারণে স্থানীয় জনগণের ইচ্ছা ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটকে গুরুত্ব দিয়ে চলা প্রয়োজন।



