ইরানের মুদ্রা রিয়াল মার্কিন ডলারের তুলনায় তীব্রভাবে হ্রাস পেয়ে তলানিতে পৌঁছেছে; এক ডলার কিনতে প্রায় ১৪ লক্ষ রিয়াল দরকার। এই অবস্থা নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামে সরাসরি প্রভাব ফেলছে, বিশেষ করে মাংসের দাম এক কেজি প্রায় এক কোটি রিয়াল পর্যন্ত উঠে গেছে, যা গৃহস্থালীর ক্রয়ক্ষমতার বাইরে।
মুদ্রা পতনের ফলে বাজারে দাম দ্রুত পরিবর্তন হচ্ছে; ব্যবসায়ীরা স্থির মূল্যে পণ্য বিক্রি করতে পারছেন না। তেহরানের গ্র্যান্ড বাজারসহ ইসফাহান, শিরাজ, কেরমানশাহের প্রধান বাণিজ্যিক এলাকা বন্ধ করে ধর্মঘটের ঘোষণা দিয়েছে। এই পদক্ষেপের মূল লক্ষ্য মুদ্রা অস্থিরতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করা।
অর্থনীতিবিদরা জানিয়েছেন যে ইরানে মুদ্রাস্ফীতি বর্তমানে ৪০ শতাংশের উপরে। এই উচ্চমাত্রার মুদ্রাস্ফীতি মূল্যের ধারাবাহিক উর্ধ্বগতি ঘটাচ্ছে এবং রিয়ালের মান আরও হ্রাসের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। দ্রুত নিয়ন্ত্রণ না করা হলে মুদ্রার অবমূল্যায়ন তীব্রতর হতে পারে।
স্থানীয় ব্যবসায়িক সমিতি মিডল ইস্ট আই রিয়াল অস্থিরতার কারণে পণ্য ক্রয়-বিক্রয় প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে বলে জানিয়েছে। তেহরানের কার্পেট বাজারের একজন বিক্রেতা উল্লেখ করেছেন যে রিয়ালের মান প্রতি মুহূর্তে পরিবর্তনশীল, ফলে দাম নির্ধারণে অপ্রত্যাশিততা দেখা দিচ্ছে এবং অনেক দোকান বন্ধ করতে বাধ্য হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও জাতিসংঘের ইরানের পারমাণবিক প্রোগ্রাম সংক্রান্ত সীমাবদ্ধতা, এই অর্থনৈতিক সংকটের মূল কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হচ্ছে। নিষেধাজ্ঞা রিয়ালের সরবরাহ শৃঙ্খলায় বাধা সৃষ্টি করে মুদ্রার অবমূল্যায়ন ত্বরান্বিত করেছে।
সাধারণ জনগণের ওপর প্রভাব সবচেয়ে বেশি। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম দ্রুত বাড়ার ফলে নিম্ন আয়ের পরিবারগুলো মৌলিক জীবনযাপনেও সমস্যার সম্মুখীন। মাংসের এক কেজি দামের বৃদ্ধি এক কোটি রিয়াল পর্যন্ত পৌঁছেছে, যা গৃহস্থালীর বাজেটকে অপ্রতিরোধ্য করে তুলেছে।
বর্তমান অর্থনৈতিক সংকটে প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের সংস্কারপন্থী সরকারও কঠিন অবস্থার মুখোমুখি। রাজনৈতিক বিরোধ এবং অভ্যন্তরীণ টানাপোড়েনের কারণে নীতি নির্ধারণে অক্ষমতা দেখা দিচ্ছে, যা বাজারের অস্থিরতা বাড়িয়ে তুলছে।
সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি ধর্মঘটকে শত্রুপক্ষের উসকানী হিসেবে উল্লেখ করে কঠোর দমনমূলক পদক্ষেপের হুমকি দিয়েছেন। এই মন্তব্যের ফলে রাজনৈতিক উত্তেজনা বাড়ছে এবং ব্যবসায়িক পরিবেশে অনিশ্চয়তা বৃদ্ধি পাচ্ছে।
অর্থনৈতিক সংকটের মাঝেও ইরান আগামী দুই বছরে ৩০টি কৃত্রিম উপগ্রহ উৎক্ষেপণের পরিকল্পনা প্রকাশ করেছে। ইরানের মহাকাশ সংস্থার প্রধান হাসান সালারিয়েহের মতে, এই প্রকল্পটি আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগের পূর্বাভাসের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
একই সময়ে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে অপ্রত্যাশিত বন্যা এবং পাহাড়ি অঞ্চলে তীব্র তুষারপাতের ঘটনা ঘটেছে, যা ইতিমধ্যে দুর্বল অর্থনীতির ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করেছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগের ফলে কৃষি ও পরিবহন খাতে ক্ষতি বাড়ছে।
বিশ্লেষকরা সতর্ক করছেন যে মুদ্রা অবমূল্যায়ন, উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি এবং আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার সমন্বয় ভবিষ্যতে বিনিয়োগের পরিবেশকে আরও কঠিন করে তুলবে। রিয়ালের স্থিতিশীলতা না পেলে বাজারে মূলধন প্রবাহ কমে যাবে এবং বেকারত্বের হার বাড়তে পারে।
সংক্ষেপে, ইরানের বর্তমান আর্থিক পরিস্থিতি মুদ্রা পতন, দামের তীব্র বৃদ্ধি, ব্যবসায়িক বন্ধ, রাজনৈতিক উত্তেজনা এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগের সমন্বয়ে গঠিত। নীতি নির্ধারকদের দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার দীর্ঘ সময় নিতে পারে এবং সামাজিক অশান্তি বাড়তে পারে।



