থাইল্যান্ডের সরকার রোববার, ৪ ডিসেম্বর, কম্বোডিয়ার সশস্ত্র বাহিনীর ওপর যুদ্ধাপরাধ এবং আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের লঙ্ঘনের অভিযোগ আনুষ্ঠানিকভাবে জানায়। থাই কর্তৃপক্ষের মতে, কম্বোডিয়ার সৈন্যরা থাই সীমান্তে বেসামরিক এলাকায় আক্রমণ চালিয়ে গৃহস্থালি সম্পত্তি ও অবকাঠামোকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে এবং নিজের মৃতদেহকে যুদ্ধক্ষেত্রে ফেলে দেওয়ার মাধ্যমে মানবিক নীতি লঙ্ঘন করেছে।
থাই যৌথ প্রেস সেন্টার প্রকাশিত বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়েছে, থাইল্যান্ডের কাছে এমন প্রমাণ রয়েছে যা দেখায় কম্বোডিয়ার সশস্ত্র বাহিনী দীর্ঘ সময় ধরে থাই ভূখণ্ডের কিছু অংশ দখল করে রেখেছে। এই দখলকৃত এলাকায় বেসামরিক বাসস্থানের পাশাপাশি সামরিক ঘাঁটি এবং অস্ত্রাগার স্থাপন করা হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।
প্রকাশিত তথ্য অনুসারে, কম্বোডিয়ার সৈন্যরা বেসামরিক জনগণকে মানবিক ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছে। আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের দৃষ্টিকোণ থেকে, এই ধরনের কৌশলকে সরাসরি নাগরিকদের ওপর আক্রমণ হিসেবে গণ্য করা হয় এবং তা যুদ্ধাপরাধের শ্রেণিতে অন্তর্ভুক্ত।
থাইল্যান্ডের মিডিয়া সূত্র, বিশেষ করে ব্যাংকক পোস্ট, জানিয়েছে যে কম্বোডিয়া রকেট এবং কামানের গোলা থাই সীমান্তে নিক্ষেপ করেছে। এই গোলাবারুদ বেসামরিক বাড়িঘর, সড়ক, বিদ্যুৎ সরবরাহ এবং স্থানীয় সম্প্রদায়ের ওপর উল্লেখযোগ্য ক্ষতি করেছে। তাছাড়া, সীমান্ত পারাপার গুলিবর্ষণ এবং সশস্ত্র সৈন্যের চলাচলও ধারাবাহিকভাবে রিপোর্ট করা হচ্ছে, যা বিদ্যমান যুদ্ধবিরতি চুক্তির স্পষ্ট লঙ্ঘন।
বর্ণিত ঘটনাগুলি কেবলমাত্র সম্পত্তিগত ক্ষতি নয়, বরং মানবিক পরিণতিও বহন করে। গৃহবিধ্বংস, বেসামরিক প্রাণহানি এবং স্থানীয় জনগণের জীবনের ধারাবাহিক ব্যাঘাতের ফলে মানবিক সংকটের সম্ভাবনা বাড়ছে। আন্তর্জাতিক সংস্থা এবং মানবাধিকার সংস্থাগুলি এই পরিস্থিতি ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ করছে।
থাই যৌথ প্রেস সেন্টার আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে আহ্বান জানিয়ে বলেছে, এই বিষয়টি তথ্য বিকৃতি বা প্রচারণার ভিত্তিতে নয়, বরং যাচাইযোগ্য প্রমাণের ওপর ভিত্তি করে বিবেচনা করা দরকার। থাইল্যান্ডের পক্ষে, এই অভিযোগের ভিত্তিতে আঞ্চলিক নিরাপত্তা সংস্থা, বিশেষ করে আসিয়ান (ASEAN) এবং জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে বিষয়টি উত্থাপন করা হতে পারে।
আঞ্চলিক বিশ্লেষকরা উল্লেখ করছেন, থাইল্যান্ড এবং কম্বোডিয়া দুটোই দীর্ঘদিনের সীমান্ত বিরোধের কারণে সংবেদনশীল অবস্থানে রয়েছে। পূর্বে ২০২৩ সালে দু’দেশের মধ্যে সীমান্তে অস্থায়ী যুদ্ধবিরতি স্বাক্ষরিত হলেও, সাম্প্রতিক ঘটনাগুলি সেই চুক্তির কার্যকারিতা প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।
একজন আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিশ্লেষক বলেন, “যদি এই অভিযোগগুলো প্রমাণিত হয়, তবে তা আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের অধীনে কঠোর শাস্তির দিকে নিয়ে যেতে পারে, এবং আঞ্চলিক শান্তি বজায় রাখতে আসিয়ানের সক্রিয় হস্তক্ষেপ প্রয়োজন হবে।” এই মন্তব্যটি থাইল্যান্ডের দাবিকে আন্তর্জাতিক আইনি কাঠামোর মধ্যে স্থাপন করার প্রচেষ্টাকে তুলে ধরে।
বর্তমানে, থাইল্যান্ডের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কম্বোডিয়ার সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক আলোচনার মাধ্যমে বিষয়টি সমাধানের চেষ্টা করছে, তবে একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের উপস্থিতি এবং স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার জন্য জাতিসংঘের মানবিক পর্যবেক্ষক দলকে আহ্বান জানানো হয়েছে। ভবিষ্যতে, আসিয়ান শীর্ষ সম্মেলনে এই বিষয়টি বিশেষ এজেন্ডা হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হতে পারে, যেখানে উভয় পক্ষের প্রতিনিধিরা সরাসরি মুখোমুখি হয়ে সমাধানের পথ খুঁজবে।
সংক্ষেপে, থাইল্যান্ডের অভিযোগে কম্বোডিয়ার সশস্ত্র বাহিনীর বেসামরিক এলাকায় আক্রমণ, মানবিক ঢাল ব্যবহার এবং যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের বিষয়গুলো আন্তর্জাতিক আইনের আলোকে গুরুতর চ্যালেঞ্জ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও মানবিক সহায়তার দৃষ্টিকোণ থেকে, এই বিরোধের সমাধানে বহুপক্ষীয় কূটনৈতিক প্রচেষ্টা এবং আন্তর্জাতিক সংস্থার সক্রিয় ভূমিকা অপরিহার্য।



