বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স রবিবার একটি অফিসিয়াল বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে জানিয়েছে যে, ঢাকা ও যুক্তরাজ্যের ম্যানচেস্টার শহরের মধ্যে পরিচালিত সরাসরি ফ্লাইটটি ১ ফেব্রুয়ারি থেকে স্থগিত করা হচ্ছে এবং নতুন কোনো চালু তারিখ নির্ধারিত হয়নি। স্থগিতের মূল কারণ হিসেবে বিমানসংখ্যার ঘাটতি, আসন্ন হজ কার্যক্রমের জন্য অতিরিক্ত বিমান প্রয়োজন, দীর্ঘমেয়াদি রক্ষণাবেক্ষণ কাজ এবং নেটওয়ার্ক জুড়ে বিমানগুলোর সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করা উল্লেখ করা হয়েছে।
এই সরাসরি সেবা প্রথমবারের মতো অক্টোবর ২০১৯-এ চালু হয়, যখন ঢাকা-সিলেট-ম্যানচেস্টার রুটটি একক বিমান দ্বারা পরিচালিত হয় এবং এ পর্যন্ত কোনো অন্য এয়ারলাইন এই রুটে সরাসরি ফ্লাইট চালায়নি। রুটটি মূলত যুক্তরাজ্যের বাঙালি সম্প্রদায়, ব্যবসায়িক ভ্রমণকারী এবং শিক্ষার্থী গোষ্ঠীর জন্য গুরুত্বপূর্ণ সংযোগ হিসেবে কাজ করেছে।
ডিসেম্বর ২০২৪-এ রুট বন্ধের গুজব ছড়িয়ে পড়ার পর যুক্তরাজ্যের বাঙালি প্রবাসীরা ম্যানচেস্টার ও লন্ডনে প্রতিবাদে রওয়ানা হয়, যা রুটের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক গুরুত্বকে পুনরায় তুলে ধরেছে। এই প্রতিবাদগুলো মিডিয়ায় ব্যাপকভাবে প্রচারিত হয় এবং বিমান সংস্থার উপর চাপ বাড়ায় যে, রুটটি পুনরায় চালু করা উচিত।
ফ্লাইটের স্থগিতের ফলে বিমান বাংলাদেশে সরাসরি দীর্ঘ দূরত্বের রুট থেকে প্রাপ্ত আয় ক্ষতিগ্রস্ত হবে। দীর্ঘ দূরত্বের ফ্লাইটগুলো সাধারণত উচ্চ মার্জিন প্রদান করে এবং কোম্পানির সামগ্রিক আর্থিক স্বাস্থ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এই আয় হ্রাসের ফলে সংস্থার পোস্ট-করোনাভাইরাস পুনরুদ্ধার পরিকল্পনায় অতিরিক্ত চাপ আসতে পারে।
যাত্রীরা এখন ম্যানচেস্টার যাওয়ার জন্য মধ্যপ্রাচ্য বা ইউরোপীয় হাবের মাধ্যমে সংযোগমূলক ফ্লাইট ব্যবহার করতে বাধ্য হবে, যা ভ্রমণের সময় ও খরচ উভয়ই বাড়িয়ে দেবে। ফলে বাণিজ্যিক এয়ারলাইনগুলো, বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের ক্যারিয়ারগুলো, এই অতিরিক্ত চাহিদা থেকে সুবিধা নিতে পারে এবং বাজার শেয়ার বাড়াতে পারে।
বিমান সংস্থার দৃষ্টিতে, বর্তমান বিমানসংখ্যার ঘাটতি মূলত সীমিত ন্যারো-বডি ফ্লিট এবং পুরোনো ওয়াইড-বডি জেটের রক্ষণাবেক্ষণ চক্রের কারণে উদ্ভূত। এই জেটগুলো দীর্ঘমেয়াদি চেক-আপে রয়েছে এবং তৎকালীন ব্যবহারযোগ্য নয়, ফলে দীর্ঘ দূরত্বের রুটে পর্যাপ্ত বিমান বরাদ্দ করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
অতিরিক্তভাবে, হজ মৌসুমের নিকটবর্তী সময়ে বিমানগুলোকে বিশেষ পাইলটেড হজ ফ্লাইটে নিয়োজিত করা হয়, যা সংস্থার জন্য অগ্রাধিকারপূর্ণ। হজ ফ্লাইটের জন্য অতিরিক্ত বিমান প্রয়োজনীয়তা সরাসরি দীর্ঘ দূরত্বের বাণিজ্যিক ফ্লাইটের জন্য উপলব্ধ বিমান সংখ্যা কমিয়ে দেয়।
বিমানটির ওয়াইড-বডি ফ্লিটের দীর্ঘমেয়াদি রক্ষণাবেক্ষণ কাজের সময়সূচি ইতিমধ্যে পরিকল্পনা করা হয়েছে, যাতে ভবিষ্যতে ফ্লিটের ব্যবহারিক দক্ষতা সর্বোচ্চ করা যায়। রক্ষণাবেক্ষণ সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত বিমানগুলোকে নেটওয়ার্কের অন্যান্য রুটে পুনর্বিন্যাস করা সম্ভব নয়, ফলে এই রুটের স্থগিত অবশ্যম্ভাবী হয়ে দাঁড়ায়।
বাণিজ্যিক দৃষ্টিকোণ থেকে, সরাসরি সংযোগের অভাব বাংলাদেশ ও যুক্তরাজ্যের পর্যটন, শিক্ষার্থী বিনিময় এবং বাণিজ্যিক মিশনগুলোর ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। সরাসরি ফ্লাইটের সুবিধা না থাকলে ব্যবসায়িক সফর ও বিনিয়োগের আকর্ষণ কমে যায়, যা উভয় দেশের বাণিজ্যিক লেনদেনে হ্রাসের সম্ভাবনা তৈরি করে।
ব্রিটিশ বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্সের প্রতিনিধিরা ইতিমধ্যে এই সংযোগের গুরুত্ব তুলে ধরে, যাতে উভয় দেশের বিনিয়োগকারী ও উদ্যোক্তাদের জন্য সহজে ভ্রমণ নিশ্চিত করা যায়। সরাসরি ফ্লাইটের অনুপস্থিতি দীর্ঘমেয়াদে যুক্তরাজ্যের বিনিয়োগের প্রবাহকে ধীর করে দিতে পারে, বিশেষ করে আইটি ও সেবা খাতের ক্ষেত্রে।
বিমান বাংলাদেশে গ্রাহকদের পুনঃবুকিং, রিফান্ড বা বিকল্প ভ্রমণ পরিকল্পনা সম্পর্কে তথ্য দিতে ঢাকা ও লন্ডনের বিক্রয় অফিস, কল সেন্টার (১৩৬৩৬ / +৮৮-০৯৬১০৯-১৩৬৩৬) এবং অনুমোদিত ট্রাভেল এজেন্টদের সঙ্গে যোগাযোগের অনুরোধ জানিয়েছে। এই পদক্ষেপটি গ্রাহক সন্তুষ্টি বজায় রাখতে এবং সম্ভাব্য আর্থিক ক্ষতি কমাতে নেওয়া হয়েছে।
বিশ্লেষকরা অনুমান করছেন যে রক্ষণাবেক্ষণ চক্র শেষ এবং হজ মৌসুমের চাহিদা কমে গেলে, বিমানটি পুনরায় এই রুটে চালু করার সম্ভাবনা থাকবে। তবে তা বাস্তবায়নের জন্য নতুন বা আধুনিক ওয়াইড-বডি জেটের ক্রয় বা লিজ করা প্রয়োজন হতে পারে, যা সংস্থার মূলধন ব্যয়কে প্রভাবিত করবে।
অস্থায়ীভাবে, বিমান বাংলাদেশে কোড‑শেয়ার চুক্তির মাধ্যমে অন্যান্য আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারদের সঙ্গে অংশীদারিত্ব গড়ে তোলার সম্ভাবনা বিবেচনা করা হচ্ছে, যাতে গ্রাহকদের পরোক্ষভাবে ম্যানচেস্টার গন্তব্যে পৌঁছানোর সুবিধা প্রদান করা যায়। এই কৌশলটি বাজার শেয়ার হারানোর ঝুঁকি কমাতে সহায়তা করবে।
সামগ্রিকভাবে, এই স্থগিতের মাধ্যমে বিমান সংস্থার ফ্লিট আধুনিকায়ন ও সম্প্রসারণের প্রয়োজনীয়তা স্পষ্ট হয়েছে। দীর্ঘ দূরত্বের রুট বজায় রাখতে পর্যাপ্ত এবং নির্ভরযোগ্য বিমান থাকা অপরিহার্য, যা ভবিষ্যতে অনুরূপ পরিস্থিতি এড়াতে সহায়তা করবে।
শেয়ারহোল্ডার, কর্মী ও গ্রাহক সকলেই এই সিদ্ধান্তের পরিণতি পর্যবেক্ষণ করছেন; স্থগিতের সময়কাল যত দীর্ঘ হবে, তত বেশি আয় পূর্বাভাস ও প্রতিযোগিতামূলক অবস্থানে প্রভাব পড়বে। সংস্থার কৌশলগত পরিকল্পনা ও বাজারের চাহিদা সামঞ্জস্য করে দ্রুত পুনরায় চালু করা সম্ভব হলে, দীর্ঘমেয়াদী ব্যবসায়িক ক্ষতি কমিয়ে আনা যাবে।



