১৯০৩ সালের জানুয়ারি মাসে ফারিদপুরের তাম্বলপুরে, জসিমউদ্দিনের জন্ম হয়। তার মাতৃদাদার বাড়ি শহর থেকে প্রায় বারো মাইল দূরে, আর তার নিজস্ব বাড়ি গোবিন্দপুর, ফারিদপুরের দুই মাইল কাছাকাছি অবস্থিত ছিল।
শৈশবের স্মৃতিগুলো জসিমউদ্দিনের নিজের লেখায় অল্পই পরিষ্কার, তবে তিনি উল্লেখ করেন যে ছোটবেলায় তিনি নিজে নিজে গান গাইতেন। শব্দগুলো সঠিকভাবে মনে না থাকলেও, তিনি নিজের সুরে স্বতঃস্ফূর্তভাবে গদ্য গঠন করতেন এবং ঘণ্টার পর ঘণ্টা গাইতে থাকতেন।
তাঁর একমাত্র শ্রোতা ছিলেন দাদাজান, যাকে তিনি প্রায়ই ‘অন্ধ দাদা’ বলে ডাকতেন। দাদাজান জন্মের পরই অন্ধ ছিলেন না; চোখের রোগে আক্রান্ত হয়ে স্থানীয় কুয়াকের পরামর্শে মরিচের পেস্ট লাগানোর ফলে দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে ফেলেছিলেন।
শিক্ষার কোনো আনুষ্ঠানিক ব্যবস্থা না থাকলেও, দাদাজান পরিবারের সঙ্গে একই ছাদের নিচে বসবাস করতেন এবং লোককথা, কবিতা, ঐতিহ্যবাহী রীতি-নীতি ও পুরাণের সমৃদ্ধ ভাণ্ডার ভাগ করে নিতেন। জসিমউদ্দিন প্রায়ই দাদাজানের সঙ্গে তার লাঠি হাতে নিয়ে ঘরবাড়ি ঘুরে বেড়াতেন।
প্রতিটি বাড়িতে পৌঁছালে দাদাজান বসে থাকতেন, আর তার মুখ থেকে যেন একের পর এক কবিতা, গল্প ও লোকগাথা বেরিয়ে আসত। জসিমউদ্দিন মনোযোগ সহকারে শোনতেন, কখনও কখনও নিজের সুরে সঙ্গীতের ছোঁয়া যোগ করতেন। এই ধরনের সাংস্কৃতিক বিনিময় গ্রাম্য সমাজের মেলবন্ধনকে দৃঢ় করত।
রাতের বেলায় দাদাজান বাড়ির আঙিনায় গল্প বলতেন। মায়ের, চাচীর মতো নারীরা এক পাশে বসে শোনার আনন্দ উপভোগ করতেন, আর কাছাকাছি গ্রাম থেকে আসা শোনার জন্য আগ্রহী মানুষদের জন্য আলাদা বসার জায়গা রাখা হতো।
দাদাজানের বর্ণনা কেবল কথায় সীমাবদ্ধ থাকত না; তিনি মাঝে মাঝে গানের সুরও গাইতেন। জসিমউদ্দিন, তার ভাইবোন ও চাচাতো ভাইবোনরা তার সঙ্গে মিলিত হয়ে ঐতিহ্যবাহী বালাড গাইত। ঐ গানের মধ্যে ‘মহুয়া সুন্দরী’, ‘রূপবান’, ‘আবদুল বাদশা’, ‘তাজুল মুলক’, ‘কৌ কৌ পাখি’ ইত্যাদি জনপ্রিয় লোকগান অন্তর্ভুক্ত ছিল।
এই অভিজ্ঞতা জসিমউদ্দিনের ভবিষ্যৎ কবিতার রচনায় গভীর প্রভাব ফেলেছিল। তিনি পরবর্তীতে বাংলার গ্রামীণ জীবন, প্রকৃতি ও মানুষের মনের কথা তুলে ধরতে গিয়ে দেশের অন্যতম জনপ্রিয় লোককবিরূপে স্বীকৃতি পেয়েছেন।
শৈশবের এই অনন্য পরিবেশ শিক্ষার দৃষ্টিকোণ থেকে গুরুত্বপূর্ণ। শিশুরা যখন স্বতঃস্ফূর্তভাবে সৃজনশীলতা প্রকাশ করে, তখন তা তাদের ভাষা, সংস্কৃতি ও আত্মবিশ্বাস গড়ে তুলতে সহায়তা করে।
শিক্ষা ক্ষেত্রের কর্মীরা যদি এই ধরনের অনানুষ্ঠানিক শিক্ষার পরিবেশকে শ্রদ্ধা ও সমর্থন করেন, তবে শিক্ষার্থীরা ঐতিহ্যবাহী জ্ঞান ও আধুনিক জ্ঞানের সমন্বয় ঘটাতে পারবে।
আজকের শিক্ষার্থীদের জন্য একটি ব্যবহারিক পরামর্শ: বাড়ি বা সম্প্রদায়ের বয়স্কদের সঙ্গে সময় কাটিয়ে তাদের গল্প ও গান শোনা, তা শুধু সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণই নয়, ভাষা দক্ষতা ও সৃজনশীলতা বৃদ্ধিতেও সহায়ক।
এইভাবে জসিমউদ্দিনের শৈশবের অভিজ্ঞতা আমাদের শেখায় যে, পারিবারিক ও সামাজিক মিথস্ক্রিয়া শিক্ষার ভিত্তি গড়ে তুলতে পারে, এবং ঐতিহ্যবাহী শিল্পের সংরক্ষণে নতুন প্রজন্মকে উদ্বুদ্ধ করতে পারে।



