যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী শনিবার বৃহৎ আকারের আক্রমণের পর ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো এবং তার স্ত্রীকে গ্রেফতার করে দেশ থেকে বহিষ্কৃত করেছে। মাদুরো ও তার সঙ্গী নিউ ইয়র্কে মাদক সংক্রান্ত অভিযোগে অভিযুক্ত, যা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তীব্র আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এই অপারেশনটি যুক্তরাষ্ট্রের বিমান ও নৌবাহিনীর সমন্বয়ে সম্পন্ন হয়, যেখানে ভেনেজুয়েলার সরকারী নিরাপত্তা বাহিনীর প্রতিরোধের পরেও লক্ষ্যবস্তুদের ধরা পড়ে। গ্রেফতারকৃত দুজনকে দ্রুত যুক্তরাষ্ট্রের ভূখণ্ডে নিয়ে যাওয়া হয় এবং তাদের আইনি প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
ইংল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী কেয়ার স্টারমার এই ঘটনার পর তৎক্ষণাৎ মন্তব্য করে, মাদুরোর শাসন শেষের জন্য কোনো দুঃখ প্রকাশ করবেন না, এমনটি তিনি জানিয়েছেন। তার এই বক্তব্য আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় ব্যাপক মনোযোগ পেয়েছে।
ল্যাটিন আমেরিকান প্রতিবেশী দেশগুলো এবং ভেনেজুয়েলার ঐতিহ্যবাহী মিত্র রাশিয়া ও চীন এই পদক্ষেপকে কঠোরভাবে নিন্দা করেছে। উভয় দেশই যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপকে আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন হিসেবে উল্লেখ করেছে।
চীন সরকার গভীর শক প্রকাশ করে এবং ভেনেজুয়েলার সার্বভৌমত্বের প্রতি আক্রমণকে কঠোরভাবে নিন্দা করেছে। চীনা বিবৃতিতে বলা হয়েছে, কোনো স্বতন্ত্র দেশের উপর বলপ্রয়োগের কোনো ন্যায়সঙ্গত কারণ নেই।
রাশিয়া যুক্তরাষ্ট্রের এই কাজকে ‘সশস্ত্র আগ্রাসনের কাজ’ বলে অভিযুক্ত করেছে এবং আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তার প্রতি হুমকি হিসেবে চিহ্নিত করেছে। রাশিয়ার দৃষ্টিতে এটি আন্তর্জাতিক শৃঙ্খলা ভঙ্গের একটি স্পষ্ট উদাহরণ।
ইরানও ভেনেজুয়েলার সার্বভৌমত্বের লঙ্ঘনকে ‘জাতীয় সার্বভৌমত্বের স্পষ্ট লঙ্ঘন’ বলে সমালোচনা করেছে, এবং যুক্তরাষ্ট্রের এই পদক্ষেপকে আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি অবহেলা হিসেবে উল্লেখ করেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প উল্লেখ করেন, যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলাকে এমনভাবে পরিচালনা করবে যাতে নিরাপদ, সঠিক ও ন্যায়সঙ্গত পরিবর্তন সম্ভব হয়। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদী হস্তক্ষেপের ইচ্ছা পুনর্ব্যক্ত করেছেন।
ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট লুলা দা সিলভা টুইটারে উল্লেখ করেন, এই ধরনের পদক্ষেপ আন্তর্জাতিক আইনের স্পষ্ট লঙ্ঘন এবং অগ্রহণযোগ্য সীমা অতিক্রম করে। তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক আইন ভঙ্গের ফলে বিশ্বে হিংসা, বিশৃঙ্খলা ও অস্থিতিশীলতা বাড়বে।
কোলম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট গুয়াস্তাভো পেট্রো এই আক্রমণকে ল্যাটিন আমেরিকার সার্বভৌমত্বের ওপর আক্রমণ হিসেবে বর্ণনা করেন এবং ভেনেজুয়েলার স্বায়ত্তশাসনের প্রতি সম্মান দাবি করেন।
চিলির প্রেসিডেন্ট গ্যাব্রিয়েল বোরিক উদ্বেগ প্রকাশ করে এবং নিন্দা জানিয়ে শান্তিপূর্ণ সমাধানের আহ্বান জানান। তিনি উল্লেখ করেন, বর্তমান সংকটের সমাধান কূটনৈতিক পথেই সম্ভব।
কিউবার প্রেসিডেন্ট মিগুয়েল দিয়াজ-কানে যুক্তরাষ্ট্রের এই কাজকে ‘অপরাধমূলক আক্রমণ’ বলে অভিহিত করেন এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে নিন্দা জানাতে আহ্বান জানান।
উরুগুয়ের সরকারী বিবৃতিতে বলা হয়েছে, তারা এই ঘটনার প্রতি গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে এবং সামরিক হস্তক্ষেপের বিরোধিতা করে। উরুগুয়ে পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে।
ট্রাম্পের সাম্প্রতিক মন্তব্যে তিনি কিউবাকে যুক্তরাষ্ট্রের আঞ্চলিক নীতি গঠনে অন্তর্ভুক্ত করার সম্ভাবনা উল্লেখ করেন, এবং কিউবাকে ‘ব্যর্থ দেশ’ হিসেবে চিহ্নিত করেন। এই বক্তব্য অঞ্চলীয় কূটনৈতিক উত্তেজনা বাড়িয়ে তুলতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রী মার্কো রুবিওও এই বিষয়ের উপর মন্তব্য করেন, তবে তার পূর্ণ বিবৃতি এখনও প্রকাশিত হয়নি। রুবিওর মন্তব্যের ভিত্তিতে ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্রের ল্যাটিন আমেরিকায় নীতি কীভাবে পরিবর্তিত হবে তা নির্ধারিত হবে।
বিশ্বের বিভিন্ন সরকার ও আন্তর্জাতিক সংস্থা এখন ভেনেজুয়েলার ভবিষ্যৎ পরিস্থিতি, মাদুরোর আইনি প্রক্রিয়া এবং যুক্তরাষ্ট্রের আঞ্চলিক নীতি নিয়ে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে। পরবর্তী কূটনৈতিক মিটিং এবং জাতিসংঘের সেশনে এই বিষয়টি প্রধান এজেন্ডা হিসেবে উঠে আসবে বলে আশা করা হচ্ছে।



