ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি শনিবার রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে জানালেন, বিক্ষোভে অংশ নেওয়া শান্তিপূর্ণ নাগরিকদের সঙ্গে আলাপ করা হবে, তবে ‘দাঙ্গাকারী’দের সঙ্গে কোনো আলোচনা করা সম্ভব নয়। তিনি বলপ্রয়োগের সম্ভাবনা উল্লেখ করে ইরানের নিরাপত্তা নীতি কঠোর করার ইঙ্গিত দিলেন।
খামেনি বিক্ষোভকারীদের দুইটি গোষ্ঠীতে ভাগ করেছেন: একদিকে যারা শান্তিপূর্ণভাবে দাবি প্রকাশ করছে, অন্যদিকে যারা তিনি ‘দাঙ্গা’ হিসেবে চিহ্নিত করছেন। তিনি জোর দিয়ে বললেন, শান্তিপূর্ণ অংশগ্রহণকারীদের সঙ্গে সরকারী সংলাপ চালানো উচিত, কিন্তু দাঙ্গাকারীদের সঙ্গে কথা বললে কোনো ফল পাওয়া যাবে না।
বক্তব্যের মধ্যে তিনি বিদেশি শক্তির হস্তক্ষেপের অভিযোগও তুলে ধরেন। ইরানের মতে, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশগুলো বিক্ষোভের পেছনে রয়েছে এবং দেশের অভ্যন্তরীণ অশান্তি সৃষ্টিতে সক্রিয় ভূমিকা পালন করছে।
রিয়ালের তীব্র মূল্যহ্রাসের দায়িত্বও তিনি বিদেশি শত্রুদের ওপর চাপিয়ে দিলেন। খামেনি উল্লেখ করেন, মুদ্রার ভয়াবহ পতন আন্তর্জাতিক শত্রুদের কূটনৈতিক ও আর্থিক চাপের ফল, যা দেশের অর্থনৈতিক সংকটকে আরও তীব্র করে তুলেছে।
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের ওপর কঠোর সতর্কতা জারি করেছেন। তিনি বলছেন, তেহরান যদি শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীদের ওপর সহিংসতা প্রয়োগ করে, তবে ওয়াশিংটন তাদের সহায়তায় হস্তক্ষেপ করবে।
ট্রাম্পের এই মন্তব্যের পটভূমিতে সাম্প্রতিক ভেনেজুয়েলায় যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযান এবং প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোর গ্রেপ্তার অন্তর্ভুক্ত, যা আন্তর্জাতিক মঞ্চে যুক্তরাষ্ট্রের সক্রিয় অবস্থানকে তুলে ধরেছে।
তবে ট্রাম্পের হুমকির বাস্তবিক পদক্ষেপ এখনো স্পষ্ট নয়; কোনো নির্দিষ্ট ব্যবস্থা বা সময়সূচি প্রকাশ করা হয়নি, ফলে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে উত্তেজনা বাড়লেও পরবর্তী পদক্ষেপ অনিশ্চিত রয়ে গেছে।
ইরানের জাতিসংঘ দূত আমির সাইয়েদ ইরাভানি এই পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের মন্তব্যকে ‘অবৈধ হুমকি’ বলে চিহ্নিত করে, এবং জাতিসংঘের মহাসচিব ও নিরাপত্তা পরিষদের সভাপতি‑কে চিঠি লিখে এই বক্তব্যের নিন্দা জানিয়েছেন।
ইরাভানি চিঠিতে তিনি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে ট্রাম্পের হুমকিকে কঠোরভাবে নিন্দা করতে এবং ইরানের সার্বভৌমত্ব রক্ষার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপকে আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
খামেনির এই কঠোর রেটোরিকের সময় ইরানে বিভিন্ন শহরে বিক্ষোভ অব্যাহত রয়েছে, যা মূলত মুদ্রার অবমূল্যায়ন ও অর্থনৈতিক মন্দার কারণে উত্থাপিত। প্রতিবাদকারীরা রিয়ালের তীব্র পতন এবং জীবনের মূল্যের বৃদ্ধি নিয়ে সরকারের নীতি পরিবর্তনের দাবি জানাচ্ছেন।
সরকার ইতিমধ্যে তেহরান ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ শহরে নিরাপত্তা বাহিনীর উপস্থিতি বাড়িয়ে দিয়েছে, এবং কয়েকজন বিক্ষোভকারী গ্রেফতার হয়েছে। নিরাপত্তা বাহিনীর কঠোর পদক্ষেপের ফলে পরিস্থিতি আরও উত্তেজনাপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
বিশ্লেষকরা অনুমান করছেন, খামেনির কঠোর সুর বিক্ষোভের ওপর আরও কঠোর দমন নীতি চালু করতে পারে, যা মানবাধিকার সংস্থার সমালোচনা বাড়াবে। একই সঙ্গে, ট্রাম্পের সতর্কতা ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ককে আরও জটিল করে তুলতে পারে।
দুই পক্ষই নিজেদের অবস্থান দৃঢ়ভাবে রক্ষা করছে; ইরান সরকার যে কোনো শক্তি ব্যবহারকে দেশের শৃঙ্খলা রক্ষার জন্য অপরিহার্য বলে বিবেচনা করছে, আর যুক্তরাষ্ট্র শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদকে সমর্থন করে আন্তর্জাতিক হস্তক্ষেপের সম্ভাবনা উন্মুক্ত রাখছে।
এই উত্তেজনা ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে নতুন গতিবিধি তৈরি করতে পারে এবং পরবর্তী সপ্তাহগুলোতে পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে তার কূটনৈতিক সম্পর্কের দিক নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।



