ভেনেজুয়েলা, যা বিশ্বের সর্ববৃহৎ অনুমানিত তেল সংরক্ষণে গর্ব করে, তার কাঁচা তেল উৎপাদন কয়েক বছর পরেও উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে না বলে বিশ্লেষকরা সতর্ক করেছেন। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক ঘোষণায়, নিকোলাস মাদুরোকে মার্কিন বাহিনী গ্রেফতার করার কয়েক ঘণ্টা পরই ভেনেজুয়েলায় বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, তবে বাস্তবিক পরিস্থিতি তেমন নয়।
দশকের পর দশক ধরে ভেনেজুয়েলার তেল উৎপাদন অবনতি দেখেছে, মূলত দেশীয় ব্যবস্থাপনা ব্যর্থতা এবং বিদেশি কোম্পানির বিনিয়োগের অভাবের ফলে। ২০০০-এর দশকে তেল শিল্পের জাতীয়করণে এক্সন মোবিল ও কনকোফিলিপসের মতো বড় আন্তর্জাতিক সংস্থার সম্পদ রাষ্ট্রের হাতে চলে যায়, ফলে তেল ক্ষেত্রের অবকাঠামো ধীরে ধীরে পুরনো হয়ে পড়ে।
যে কোনো বিদেশি তেল সংস্থা যদি ভেনেজুয়েলায় বিনিয়োগের পরিকল্পনা করে, তবে তাকে নিরাপত্তা ঝুঁকি, ধ্বংসপ্রাপ্ত অবকাঠামো, যুক্তরাষ্ট্রের মাদুরো গ্রেফতার অপারেশনের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন এবং দীর্ঘমেয়াদী রাজনৈতিক অস্থিরতা সহ নানা চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হবে। এই বিষয়গুলোকে কেন্দ্র করে বিশ্লেষকরা রায় দিয়েছেন যে, যুক্তরাষ্ট্রের তেল কোম্পানিগুলো নিশ্চিত পেমেন্ট গ্যারান্টি এবং ন্যূনতম নিরাপত্তা ব্যবস্থা না পেলে দেশে ফিরে আসবে না।
অধিকন্তু, বর্তমান আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা বজায় থাকলে ভেনেজুয়েলায় বিদেশি বিনিয়োগের পথ আরও সংকীর্ণ হয়ে যায়। নিষেধাজ্ঞা অপসারণ এবং তেল শিল্পে বিদেশি অংশীদারিত্বের জন্য আইনগত সংস্কার না করা পর্যন্ত বড় তেল সংস্থাগুলো বড় পরিমাণে মূলধন ঢালতে অনিচ্ছুক থাকবে।
ভেনেজুয়েলা ১৯৭০-এর দশকে তেল শিল্পের সম্পূর্ণ জাতীয়করণ করে, এবং ২০০০-এর দশকে রাষ্ট্রের তেল সংস্থা পিডিভিএসএ (PDVSA) নিয়ন্ত্রণে জয়েন্ট ভেঞ্চার মডেল চালু করে। এই সময়ে শেভরনসহ বেশ কয়েকটি বহুজাতিক তেল সংস্থা চুক্তি ভেঙে বেরিয়ে যায়, আর কিছু সংস্থা চুক্তি না পেয়ে আন্তর্জাতিক সালিশি আদালতে মামলা দায়ের করে।
শক্তি ও ভূ-রাজনৈতিক কৌশল বিশ্লেষক থমাস ওডোনেল বলেছেন, যদি ট্রাম্পের প্রশাসন মাদুরোর গ্রেফতারকে শান্তিপূর্ণভাবে সমাধান করতে পারে এবং কোনো বড় প্রতিরোধ না থাকে, তবে পাঁচ থেকে সাত বছরের মধ্যে অবকাঠামো মেরামত এবং বিনিয়োগের শর্ত পূরণ হলে তেল উৎপাদনে উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি সম্ভব। তিনি আরও উল্লেখ করেছেন, ভেনেজুয়েলার ভারী তেল গালফ কোস্টের রিফাইনারিগুলোর জন্য উপযোগী এবং ফ্র্যাকিং থেকে উৎপন্ন হালকা তেলের সঙ্গে মিশিয়ে বিক্রি করা যায়।
তবে এই সম্ভাব্য উন্নয়নটি বহু শর্তের উপর নির্ভরশীল। নিরাপত্তা পরিস্থিতি স্থিতিশীল না হলে, অবকাঠামো পুনর্নির্মাণে প্রয়োজনীয় মূলধন আকর্ষণ করা কঠিন হবে। একই সঙ্গে, আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা অব্যাহত থাকলে তেল রপ্তানি ও বিক্রয় চ্যানেল সীমাবদ্ধ থাকবে, যা তেল বাজারে ভেনেজুয়েলার অংশীদারিত্বকে কমিয়ে দেবে।
বাজারের দৃষ্টিকোণ থেকে, ভেনেজুয়েলার তেল সংরক্ষণে থাকা বিশাল পরিমাণের তেল এখনও বিশ্বব্যাপী তেল সরবরাহের একটি সম্ভাব্য উৎস হিসেবে বিবেচিত। তবে বর্তমান বিনিয়োগের অনিশ্চয়তা এবং রাজনৈতিক ঝুঁকি তেল মূল্যের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের রিফাইনারিগুলো যদি ভেনেজুয়েলার ভারী তেল ব্যবহার করতে চায়, তবে তা নিশ্চিত নিরাপত্তা ও পেমেন্ট গ্যারান্টি ছাড়া সম্ভব নয়।
সারসংক্ষেপে, ভেনেজুয়েলার তেল উৎপাদন দ্রুত বাড়ার সম্ভাবনা সীমিত, যদিও যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চ পর্যায়ের বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি রয়েছে। তেল শিল্পের পুনরুজ্জীবনের জন্য নিরাপত্তা, অবকাঠামো, আইনগত সংস্কার এবং আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা অপসারণের সমন্বিত পদক্ষেপ প্রয়োজন। এই শর্তগুলো পূরণ না হলে, ভেনেজুয়েলার বিশাল তেল সংরক্ষণই বিশ্ব তেল বাজারে উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলতে পারবে না।



