মিয়ানমার সামরিক শাসন ৪ই জানুয়ারি স্বাধীনতা দিবসের উপলক্ষে বার্ষিক দয়াপত্রের অংশ হিসেবে ৬,১৩৪ জন পুরুষ ও নারীর বন্দীকে মুক্তি দেওয়ার সিদ্ধান্ত জানায়। জাতীয় প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা পরিষদ একটি বিবৃতি প্রকাশ করে, যেখানে এই বন্দীদের সংশ্লিষ্ট কারাগার, আটক কেন্দ্র ও শিবিরে থাকা অবস্থায় দয়াপত্র প্রদান করা হয়েছে।
বিবৃতিতে আরও উল্লেখ করা হয়েছে যে, ৫২ জন বিদেশি বন্দীকে একই সঙ্গে মুক্তি দিয়ে দেশ থেকে বহিষ্কৃত করা হবে। এই পদক্ষেপটি স্বাধীনতা দিবসের ৭৮তম বার্ষিকীকে মানবিক ও দয়ালু ভিত্তিতে নেওয়া হয়েছে বলে সরকার ব্যাখ্যা করেছে।
২০২১ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে সামরিক কুপের পর থেকে হাজার হাজার প্রতিবাদকারী ও কর্মী গ্রেফতার করা হয়েছে, যা দেশের সংক্ষিপ্ত গণতান্ত্রিক সময়কে শেষ করে গৃহযুদ্ধের মঞ্চ তৈরি করেছে। দয়াপত্রের ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে এই দীর্ঘকালীন মানবাধিকার লঙ্ঘনের প্রেক্ষাপট আবার আলোচনার মুখে এসেছে।
ইনসেইন কারাগারের সামনে রবিবার সকালে শত শত মানুষ তাদের পরিবারের নামসহ কাগজ হাতে ধরে অপেক্ষা করছিল। বন্দীদের মুক্তি প্রত্যাশা করে তারা দীর্ঘ সময়ের দুঃখ ও উদ্বেগকে একত্রে ভাগ করে নিচ্ছিল।
এক সপ্তাহ আগে সামরিক শাসন একটি ধাপে ধাপে চলমান এক মাসব্যাপী নির্বাচনের ভোটদান শুরু করে। সরকার এই নির্বাচনকে গণতন্ত্রের পথে অগ্রগতি হিসেবে উপস্থাপন করেছে, যদিও আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক ও মানবাধিকার সংস্থা এটিকে সামরিক শাসনের মিথ্যা মুখোশ হিসেবে সমালোচনা করেছে।
প্রো-সামরিক ইউনিয়ন সলিডারিটি অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টি (USDP) প্রথম পর্যায়ে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। রাষ্ট্রমাধ্যমে প্রকাশিত ফলাফলে USDP নিম্নসভার আসনগুলোর ৯০ শতাংশ জয় করেছে বলে জানানো হয়েছে।
দয়াপত্রের ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে সরকার দাবি করে যে, এই পদক্ষেপটি মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে নেওয়া হয়েছে এবং দেশের সামাজিক সংহতি বাড়াবে। তবে মানবাধিকার কর্মী ও বিদেশি বিশ্লেষকরা সতর্ক করে দিচ্ছেন যে, দয়াপত্রের পিছনে রাজনৈতিক স্বার্থ লুকিয়ে থাকতে পারে।
বন্দী মুক্তি পাওয়ার ফলে কিছু পরিবারে স্বল্পমেয়াদে স্বস্তি আসবে, তবে দীর্ঘমেয়াদে এই পদক্ষেপটি সামরিক শাসনের বৈধতা বাড়াতে পারে বলে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। বিশেষ করে নির্বাচনের প্রথম পর্যায়ে USDP-এর বিশাল জয়কে এই দয়াপত্রের মাধ্যমে জনমতকে প্রভাবিত করার কৌশল হিসেবে দেখা হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কিছু দেশ দয়াপত্রকে মানবিক উদ্যোগ হিসেবে স্বাগত জানিয়েছে, তবে একই সঙ্গে মিয়ানমারের রাজনৈতিক দিকনির্দেশনা ও মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন দয়াপত্রের পরিপ্রেক্ষিতে মিয়ানমারকে গণতান্ত্রিক সংস্কার চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছে।
দ্যুতি ও দায়িত্বের মধ্যে সামরিক শাসন যে দয়াপত্রের মাধ্যমে জনমতকে মসৃণ করতে চায়, তা ভবিষ্যতে নির্বাচনের বাকি পর্যায়ে কী প্রভাব ফেলবে তা অনিশ্চিত। যদি দয়াপত্রের মাধ্যমে অর্জিত জনসাধারণের সমর্থন নির্বাচনের পরবর্তী ধাপে USDPকে আরও শক্তিশালী করে, তবে দেশের রাজনৈতিক দৃশ্যপট আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে।
অন্যদিকে, দয়াপত্রের মাধ্যমে মুক্তি পাওয়া বন্দীদের মধ্যে কিছু ব্যক্তি এখনও সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে সক্রিয়ভাবে প্রতিবাদ চালিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এ ধরনের প্রতিরোধের ফলে দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা পরিস্থিতি পুনরায় উত্তেজনা পেতে পারে।
সামরিক শাসনের এই দয়াপত্রের ঘোষণা এবং চলমান নির্বাচনের সমন্বয়কে বিশ্লেষকরা মিয়ানমারের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক কাঠামোর একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে দেখছেন। দয়াপত্রের বাস্তবায়ন ও তার পরবর্তী রাজনৈতিক পদক্ষেপগুলো দেশের গণতান্ত্রিক রূপান্তরের পথে কী প্রভাব ফেলবে, তা সময়ই নির্ধারণ করবে।
সারসংক্ষেপে, মিয়ানমার সামরিক শাসন স্বাধীনতা দিবসের উপলক্ষে ৬,১৩৪ জন বন্দীকে দয়াপত্রে মুক্তি দিচ্ছে, যার মধ্যে ৫২ জন বিদেশি বন্দীও অন্তর্ভুক্ত। এই পদক্ষেপটি মানবিক ভিত্তিতে নেওয়া হলেও, চলমান নির্বাচনের প্রেক্ষাপটে এর রাজনৈতিক প্রভাব নিয়ে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক উভয় স্তরে তীব্র আলোচনা চলছে।



