ইউরো জোনের উৎপাদন খাত ডিসেম্বর মাসে আরও সংকোচনের মুখে পড়েছে, তবে এশিয়ার প্রধান রপ্তানি দেশগুলোতে কারখানা কার্যক্রম পুনরুদ্ধার দেখাচ্ছে। ইউরো জোনের ২০টি দেশের উৎপাদন সূচক (PMI) ডিসেম্বর মাসে ৪৮.৮ এ নেমে এসেছে, যা নভেম্বরের ৪৯.৬ থেকে হ্রাস পেয়েছে এবং নয় মাসের সর্বনিম্ন মান। ৫০-এর নিচে থাকা এই সংখ্যা দ্বিতীয় মাস ধারাবাহিকভাবে সংকোচন নির্দেশ করে।
এই সংকোচনের মূল কারণ হল উৎপাদন পরিমাণের প্রথম দশ মাসে হ্রাস এবং নতুন অর্ডারের ধারাবাহিক পতন। সার্ভে অনুযায়ী, জার্মানি, ইতালি এবং স্পেনের মতো বড় অর্থনীতিগুলোতে উৎপাদন সূচক আবার সংকোচন এলাকায় ফিরে এসেছে। জার্মানির সূচক আটটি পর্যবেক্ষিত দেশের মধ্যে সর্বনিম্নে নেমে ১০ মাসের সর্বনিম্ন মানে পৌঁছেছে, আর ইতালি ও স্পেনও পুনরায় সংকোচনের সীমার মধ্যে প্রবেশ করেছে।
হ্যামবুর্গ কমার্শিয়াল ব্যাংকের প্রধান অর্থনীতিবিদ সাইরাস ডি লা রুবিয়া উল্লেখ করেছেন, ইউরো জোনের উৎপাদন পণ্যের চাহিদা আবার ধীর হয়ে গেছে। তিনি বলেন, কোম্পানিগুলো আগামী বছরের জন্য কোনো দৃঢ় পরিকল্পনা গড়ে তুলতে পারছে না এবং সতর্কতা অবলম্বন করছে, যা অর্থনীতির জন্য ক্ষতিকর।
ফ্রান্সের ক্ষেত্রে কিছুটা আলাদা দৃষ্টিভঙ্গি দেখা গেছে; দেশের উৎপাদন সূচক ৪২ মাসের সর্বোচ্চ মানে পৌঁছে, যা অঞ্চলের মধ্যে একমাত্র উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। যুক্তরাজ্যেও, ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাইরে, ডিসেম্বর মাসে উৎপাদন কার্যক্রম ১৫ মাসের সর্বোচ্চ গতি অর্জন করেছে, যা আর্থিক মন্ত্রী রেচেল রিভসের বাজেটের কিছু রিলিফের ফলে চাহিদা পুনরুদ্ধারকে ত্বরান্বিত করেছে।
এশিয়ার দিকে নজর দিলে, দক্ষিণ কোরিয়া ও তাইওয়ানের উৎপাদন সূচক ডিসেম্বর মাসে ধারাবাহিক হ্রাসের পর পুনরায় বৃদ্ধি পেয়েছে। অধিকাংশ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ান দেশও শক্তিশালী বৃদ্ধির গতি বজায় রেখেছে। একই সময়ে, চীনের উৎপাদন সূচক মঙ্গলবার প্রকাশিত হয়, যেখানে অপ্রত্যাশিতভাবে উৎপাদন কার্যক্রমে উত্থান দেখা গেছে। এই উত্থান মূলত ছুটির আগে অর্ডার বৃদ্ধির ফলে ঘটেছে।
প্রাইভেট সার্ভে অনুযায়ী, এশিয়ার প্রধান রপ্তানি দেশগুলোতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) পণ্যের চাহিদা বাড়ার ফলে উৎপাদন খাতে নতুন উদ্দীপনা দেখা যাচ্ছে। বিশেষ করে সেমিকন্ডাক্টর ও ইলেকট্রনিক্স শিল্পে AI-সম্পর্কিত উপাদানের চাহিদা বৃদ্ধি পেয়েছে, যা উৎপাদন ক্ষমতা সম্প্রসারণে সহায়তা করছে।
ইউরো জোনের সংকোচন এবং এশিয়ার পুনরুজ্জীবনের পারস্পরিক প্রভাব বাজারে মুদ্রা ও পণ্যের প্রবাহে প্রভাব ফেলবে বলে বিশ্লেষকরা অনুমান করছেন। ইউরো জোনের উৎপাদন হ্রাস ইউরোর মানে চাপ সৃষ্টি করতে পারে, যা রপ্তানি-নির্ভর দেশগুলোর জন্য মুনাফা হ্রাসের ঝুঁকি বাড়াবে। অন্যদিকে, এশিয়ার রপ্তানি ক্ষমতা বৃদ্ধি ইউরোপীয় বাজারে সরবরাহের ভারসাম্য পুনরুদ্ধার করতে পারে এবং বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলে চাপ কমাতে সহায়তা করবে।
ভবিষ্যৎ দিকে তাকালে, ইউরো জোনের উৎপাদন পুনরুদ্ধার এখনও অনিশ্চিত, কারণ কোম্পানিগুলো সতর্কতা অবলম্বন করছে এবং চাহিদা পুনরায় তীব্র না হওয়া পর্যন্ত বিনিয়োগে সংকোচন বজায় রাখতে পারে। এশিয়ার ক্ষেত্রে, AI এবং উচ্চ প্রযুক্তি পণ্যের চাহিদা অব্যাহত থাকলে উৎপাদন বৃদ্ধি ধারাবাহিক হতে পারে, তবে বৈশ্বিক মন্দা, সরবরাহ শৃঙ্খলের ব্যাঘাত বা ভূ-রাজনৈতিক ঝুঁকি এই প্রবণতাকে প্রভাবিত করতে পারে।
সারসংক্ষেপে, ইউরো জোনের উৎপাদন সংকোচন অব্যাহত থাকলেও এশিয়ার প্রধান রপ্তানি দেশগুলোতে উৎপাদন পুনরুদ্ধার এবং AI-চালিত চাহিদা বৃদ্ধির ফলে বৈশ্বিক বাণিজ্য পরিবেশে নতুন গতিপ্রকোপ দেখা যাচ্ছে। নীতিনির্ধারক ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোকে এই দ্বিমুখী প্রবণতাকে বিবেচনা করে কৌশল নির্ধারণ করতে হবে, যাতে উভয় অঞ্চলের ঝুঁকি ও সুযোগকে সঠিকভাবে ব্যবহার করা যায়।



