যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গত রাত (বাংলাদেশ সময় শনিবার ভোর) ভেনেজুয়েলা ও তার পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে হঠাৎ সামরিক অভিযান চালানোর ঘোষণা দেন। তিনি টুইটারে ৭৪ শব্দের একটি পোস্টে উল্লেখ করেন যে দেশের সামরিক ঘাঁটি ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোতে আঘাত হানা হয়েছে এবং প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ও তার স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে আটক করা হয়েছে।
ট্রাম্পের পোস্টে উল্লেখিত আক্রমণটি একাধিক লক্ষ্যবস্তুতে সমন্বিতভাবে পরিচালিত হয়েছে, যার মধ্যে ভেনেজুয়েলার প্রধান সামরিক ঘাঁটি, বিমানবন্দর এবং যোগাযোগ নেটওয়ার্ক অন্তর্ভুক্ত। একই সঙ্গে তিনি মাদুরোকে হেলিকপ্টারে তুলে নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন, যদিও পরে এই তথ্যের সঠিকতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়।
আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এই পদক্ষেপের বৈধতা নিয়ে তীব্র বিতর্ক দেখা দিয়েছে। বেশ কয়েকটি দেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থা যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপকে আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন হিসেবে চিহ্নিত করেছে এবং ভেনেজুয়েলার সার্বভৌমত্বের প্রতি আঘাতের ইঙ্গিত দিয়েছে।
মাদুরো ২০১৩ সালে ক্ষমতায় আসার পর থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক টানাপোড়েনের মধ্যে রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে ভেনেজুয়েলার সরকারকে মাদক পাচার, মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার ব্যাহতকারী হিসেবে সমালোচনা করে আসছে। ট্রাম্পের এই হঠাৎ পদক্ষেপকে এই অভিযোগের ধারাবাহিকতা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
এই ঘটনাকে ১৯৮৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রের প্যানামা নেতা ম্যানুয়েল নরিয়েগার গ্রেফতারের সঙ্গে তুলনা করা হচ্ছে। নরিয়েগা ১৯৮৪ থেকে ১৯৮৯ পর্যন্ত ক্ষমতায় ছিলেন এবং তার শাসনকালে নির্বাচনের বৈধতা নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক ছিল। যুক্তরাষ্ট্রও নরিয়েগার বিরুদ্ধে মাদক পাচার অভিযোগ তুলেছিল এবং সামরিক হস্তক্ষেপের প্রস্তুতি নেয়।
দুই ঘটনায়ই নির্বাচনের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন, যুক্তরাষ্ট্রের মাদক সংক্রান্ত অভিযোগ এবং হস্তক্ষেপের আগে সামরিক উপস্থিতি বাড়ানোর কৌশল দেখা যায়। উভয় ক্ষেত্রেই প্রেসিডেন্টের ক্ষমতায় আসার পরই যুক্তরাষ্ট্রের নীতি পরিবর্তন দ্রুত ও অপ্রত্যাশিতভাবে প্রকাশ পেয়েছে।
তবে নরিয়েগা অপারেশনের এবং মাদুরো হস্তক্ষেপের মধ্যে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য রয়েছে। নরিয়েগার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র ও প্যানামার মধ্যে সীমিত যুদ্ধের পরই প্যানামা জাতীয় পরিষদ তাকে সর্বোচ্চ নেতা ঘোষণা করে এবং যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধের ঘোষণা দেয়। এরপর যুক্তরাষ্ট্র ‘অপারেশন জাস্ট কজ’ নামে সামরিক অভিযান চালায়।
নরিয়েগা প্রথমে ভেনেজুয়েলার ভ্যাটিকান দূতাবাসে আশ্রয় নেন, কিন্তু জানুয়ারি ১৯৯০-এ আত্মসমর্পণ করেন। তার পর যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে গিয়ে ৪০ বছরের কারাদণ্ড প্রদান করা হয়। মাদুরোর ক্ষেত্রে হেলিকপ্টার দিয়ে তুলে নেওয়ার তথ্যের পরেও তার বর্তমান অবস্থান স্পষ্ট করা হয়নি এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তার মুক্তি বা বিচার সংক্রান্ত প্রশ্ন রয়ে গেছে।
ভেনেজুয়েলা ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের ভবিষ্যৎ এখন অনিশ্চিত। ট্রাম্পের এই হঠাৎ পদক্ষেপের ফলে দু’দেশের কূটনৈতিক সংলাপের পথ সংকীর্ণ হতে পারে এবং অঞ্চলের নিরাপত্তা পরিবেশে অতিরিক্ত উত্তেজনা দেখা দিতে পারে।
আঞ্চলিক দেশগুলোও এই ঘটনার প্রতি উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। কিছু দেশ যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপকে সমালোচনা করে এবং ভেনেজুয়েলার সার্বভৌমত্বের প্রতি সম্মান দাবি করেছে, অন্যদিকে কিছু দেশ নিরাপত্তা ও মাদক সমস্যার সমাধানে যুক্তরাষ্ট্রের দৃঢ় পদক্ষেপকে স্বাগত জানিয়েছে।
পরবর্তী সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ভেনেজুয়েলার সরকার কীভাবে কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে বিষয়টি সমাধান করবে, তা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টিতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়াবে। সম্ভাব্য আইনি চ্যালেঞ্জ, মানবিক সহায়তা এবং অঞ্চলের স্থিতিশীলতা রক্ষার জন্য দ্বিপাক্ষিক বা বহুপাক্ষিক আলোচনার দরকার হতে পারে।



