সাদেক আলী সরকার, যিনি নিজের বাড়ি নির্মাণের জন্য সংগ্রহ করা ইটগুলো দিয়ে স্কুলের প্রাঙ্গণ গড়ে তোলেন, শনিবার শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তার শেষকৃত্য তার প্রতিষ্ঠিত ডাকরা ডিগ্রি কলেজের মাঠে অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে শিক্ষার্থী ও কর্মীরা শোক প্রকাশ করে।
সাদেক আলী ১৯৬৯ সালে শুরু হওয়া ডাকরা দ্বিপার্শ্ব উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা সেক্রেটারি ছিলেন। তখন বিদ্যালয়ের জন্য কোনো ভবন ছিল না; শিক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় কাঠামো গড়ে তোলার দায়িত্বই তার হাতে পড়ে।
বাড়ি বানাতে ইট সংগ্রহের সময়, তিনি দেখলেন বিদ্যালয়ের অবস্থা কতটা দুর্বল। তাই নিজের বাড়ির জন্য সংরক্ষিত ইটগুলো দান করে পুরো স্কুলের পাঁচ কক্ষবিশিষ্ট পাকা ভবন নির্মাণের কাজ শুরু করেন। এই সিদ্ধান্তের ফলে তিনি নিজের স্বপ্নের বাড়ি গড়ে তুলতে পারেননি, তবে শিক্ষার জন্য একটি দৃঢ় ভিত্তি স্থাপন করেন।
নির্মাণ কাজের তত্ত্বাবধানে তিনি নিজে হাতে সব কাজ পর্যবেক্ষণ করেন। ইটের গুঁড়ো, সিমেন্ট মিশ্রণ থেকে শুরু করে ছাদ বসানো পর্যন্ত সবকিছুই তার নজরে থাকে। ফলস্বরূপ, বিদ্যালয়টি দ্রুতই শিক্ষার্থীদের জন্য কার্যকরী পরিবেশ পায়।
সাদেক আলীর এই ত্যাগের পর থেকে তিনি বিদ্যালয়ের সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত ছিলেন। ১৮ বছর ধরে তিনি প্রতিষ্ঠানের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং শিক্ষার মানোন্নয়নে নানা উদ্যোগ গ্রহণ করেন। তার নেতৃত্বে বিদ্যালয়টি স্থানীয় শিক্ষার অন্যতম কেন্দ্র হিসেবে স্বীকৃতি পায়।
১৯৯৪ সালে তিনি নিজের তিন বিঘা জমি ব্যবহার করে ডাকরা কলেজের ভিত্তি স্থাপন করেন। এলাকার কয়েকজনের সহযোগিতায় কলেজটি গড়ে ওঠে এবং পরে ডিগ্রি কলেজে রূপান্তরিত হয়। তিনি কলেজের প্রথম প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি হন এবং শিক্ষার প্রসারে সক্রিয় ভূমিকা রাখেন।
২০০৩ সালের ৩ এপ্রিল প্রথম আলোতে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনেও সাদেক আলীর এই অনন্য ত্যাগের কথা তুলে ধরা হয়। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, তিনি নিজের বাড়ি না করে পুরো গ্রামকে শিক্ষার আলোতে আলোকিত করতে চান। এই গল্পটি স্থানীয় জনগণের মধ্যে অনুপ্রেরণা জোগায়।
বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে স্বাস্থ্যের অবনতি দেখা দিলেও, সাদেক আলী কলেজের হিতৈষী সদস্য হিসেবে সক্রিয়ভাবে কাজ চালিয়ে যান। তিনি প্রতিদিন সকালে কলেজে উপস্থিত থাকতেন, শিক্ষকদের সময়মতো আসা-যাওয়া তদারকি করতেন এবং শিক্ষার্থীদের অনুপস্থিতি বা বাজারে ঘুরে বেড়ানো দেখলে তৎক্ষণাৎ কলেজে ফিরিয়ে আনতেন।
বর্তমান অধ্যক্ষ আব্দুর রউফ জানান, সাদেক আলী কোনো ক্লাসে বসে না, বরং পুরো প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম তত্ত্বাবধানের দায়িত্ব নিতেন। নতুন কোনো নির্মাণ কাজ শুরু হলে তিনি নিজের কাজের মতো তদারকি করে নিশ্চিত করতেন যে সবকিছু সঠিকভাবে সম্পন্ন হয়। তার এই নিঃস্বার্থ মনোভাব শিক্ষকমণ্ডলী ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে গভীর প্রভাব ফেলেছিল।
সাদেক আলীর মৃত্যুর পর তার বাড়ি এখনও মাটির তৈরি। বাড়ির সামনে বাঁশের চাটাই দিয়ে একটি অতিরিক্ত ঘর যুক্ত করা হয়েছে, তবে ইটের কোনো ব্যবহার দেখা যায় না। বাথরুমের অভাব সত্ত্বেও তিনি জীবনের শেষ দিনগুলো মাটির ঘরে কাটিয়েছেন।
বাড়িতে বর্তমানে তার ছোট ভাই আমির হামজা বসবাস করছেন। ভাইয়ের সঙ্গে তার শেষ দিনগুলো কাটানোর সময়, পরিবারটি সাদেক আলীর ত্যাগ ও শিক্ষার প্রতি নিবেদনকে স্মরণ করে।
শিক্ষা ক্ষেত্রের এই ধরনের ত্যাগের গল্প থেকে আমরা শিখতে পারি যে, ব্যক্তিগত স্বার্থের চেয়ে সমাজের মঙ্গলের জন্য কাজ করা কতটা গুরুত্বপূর্ণ। ভবিষ্যতে যদি আমরা নিজের সম্পদকে শিক্ষার উন্নয়নে ব্যবহার করতে পারি, তবে সমাজের সামগ্রিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত হবে। আপনার আশেপাশে যদি এমন কোনো উদ্যোগের সুযোগ থাকে, তবে তা সমর্থন করার কথা বিবেচনা করুন।



