বিরোধী নেতা ও নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী মারিয়া কোরিনা মাচাদো, যুক্তরাষ্ট্রের মাধ্যমে প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে আটক করার পর প্রথমবারের মতো জনসমক্ষে একটি চিঠি প্রকাশ করে সরকার পরিবর্তনের দাবি তুলে ধরেছেন। তিনি ভেনেজুয়েলার জনগণকে উদ্দেশ্য করে লিখে বলেছেন, দেশের সার্বভৌমত্ব পুনঃপ্রতিষ্ঠা এখন জরুরি।
মাচাদো চিঠিতে ২০২৪ সালের নির্বাচনে মাদুরোর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী এডমুন্ডো গঞ্জালেজ উরুতিয়াকে পরবর্তী প্রেসিডেন্ট হিসেবে স্বীকৃতি দিতে আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি গঞ্জালেজকে অবিলম্বে সংবিধানিক দায়িত্ব গ্রহণের এবং সামরিক বাহিনীর সকল স্তরের কর্মকর্তাকে তাকে প্রধান সেনাপতি হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার অনুরোধ করেন।
মাচাদো উল্লেখ করেন, মাদুরো এখন আন্তর্জাতিক আদালতের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন এবং ভেনেজুয়েলার নাগরিক ও বিদেশী জনগণের ওপর সংঘটিত গুরুতর অপরাধের জন্য তাকে জবাবদিহি করতে হবে। তিনি বলেন, মাদুরো সংলাপের মাধ্যমে সমস্যার সমাধানে বারবার অস্বীকৃতি জানিয়েছেন, ফলে যুক্তরাষ্ট্রের আইন প্রয়োগের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়িত হয়েছে।
চিঠিতে মাচাদো আরও জোর দিয়ে বলেন, ভেনেজুয়েলায় এখন জনগণের শাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠা, শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা, রাজনৈতিক বন্দিদের মুক্তি এবং নতুন দেশ গড়ার সময় এসেছে। তিনি দেশের প্রবাসী নাগরিকদের পুনরায় দেশে ফিরিয়ে আনার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেছেন।
মাচাদোর দাবি অনুযায়ী, ২০২৪ সালের নির্বাচনে গঞ্জালেজ উরুতিয়া প্রকৃত বিজয়ী এবং তিনি ভেনেজুয়েলার বৈধ প্রেসিডেন্ট। নির্বাচনের পর গঞ্জালেজ স্পেনে গিয়ে বসবাস করছেন, যেখানে তিনি মাচাদোর চিঠি তার এক্স (X) অ্যাকাউন্টে শেয়ার করে দেশের বর্তমান সংকটের কথা উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, মাতৃভূমি পুনর্গঠনের জন্য জনগণ সম্পূর্ণ প্রস্তুত।
মাচাদোর এই আহ্বান আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় ব্যাপক দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে, তবে ভেনেজুয়েলার সরকার থেকে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক মন্তব্য পাওয়া যায়নি। মাদুরোর প্রশাসন চিঠির বিষয়বস্তু প্রত্যাখ্যান করে এবং দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয় হিসেবে বিবেচনা করে কোনো পদক্ষেপের ইঙ্গিত দেয়নি।
মাদুরোর সমর্থকরা যুক্তি দেন, নির্বাচনের ফলাফল সংবিধানিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নিশ্চিত হয়েছে এবং কোনো বহিরাগত হস্তক্ষেপ দেশের স্বায়ত্তশাসনকে ক্ষুণ্ন করবে। তারা মাচাদোর দাবি ও গঞ্জালেজের স্বীকৃতিকে অবৈধ বলে চিহ্নিত করে।
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের সরকার মাদুরোর আটককে আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার একটি পদক্ষেপ হিসেবে উপস্থাপন করেছে এবং ভেনেজুয়েলার মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপের ইঙ্গিত দিয়েছে। এই পদক্ষেপের ফলে ভেনেজুয়েলার রাজনৈতিক পরিবেশে নতুন উত্তেজনা দেখা দিয়েছে।
বিশ্লেষকরা উল্লেখ করেন, মাচাদোর চিঠি এবং গঞ্জালেজের সমর্থন ভেনেজুয়েলার রাজনৈতিক দৃশ্যপটে একটি নতুন মোড়ের সূচনা করতে পারে। যদি সামরিক বাহিনী গঞ্জালেজকে প্রধান সেনাপতি হিসেবে স্বীকৃতি দেয়, তবে তা সরকার পরিবর্তনের সম্ভাবনা বাড়াতে পারে।
তবে দেশের অভ্যন্তরে অর্থনৈতিক সংকট, মুদ্রা অবমূল্যায়ন এবং মানবিক সংকটের কারণে জনগণের তীব্র অসন্তোষ ইতিমধ্যে বিদ্যমান। মাচাদোর আহ্বান এই অসন্তোষকে রাজনৈতিক চাহিদায় রূপান্তরিত করার চেষ্টা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ভেনেজুয়েলার আন্তর্জাতিক সম্পর্কের দিক থেকে, যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ এবং মাদুরোর আন্তর্জাতিক আদালতে মোকাবিলা দেশের কূটনৈতিক অবস্থানকে জটিল করে তুলেছে। মাচাদোর দাবি এবং গঞ্জালেজের প্রত্যাবর্তন সম্ভাব্যভাবে আন্তর্জাতিক সমর্থন অর্জনের একটি কৌশল হতে পারে।
পরবর্তী সময়ে, মাচাদো এবং গঞ্জালেজের পদক্ষেপের ফলাফল নির্ভর করবে ভেনেজুয়েলার সামরিক ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠানের প্রতিক্রিয়ার ওপর। যদি তারা মাচাদোর আহ্বানকে সমর্থন করে, তবে দেশের রাজনৈতিক কাঠামোতে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন ঘটতে পারে। অন্যদিকে, যদি মাদুরোর সরকার শক্তি বজায় রাখে, তবে বিদ্রোহী গোষ্ঠীর কার্যক্রম সীমাবদ্ধ থাকতে পারে।
এই পরিস্থিতিতে ভেনেজুয়েলার জনগণ এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় উভয়ই দেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। মাচাদোর চিঠি এবং গঞ্জালেজের মন্তব্য দেশের রাজনৈতিক পুনর্গঠনের সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ উভয়ই তুলে ধরেছে।



