সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা শারমিন এস মুরশিদ ২০২৬ সালের জাতীয় সমাজসেবা দিবসের অনুষ্ঠানে উল্লেখ করেন যে, দেশের বৃহৎ প্রকল্পগুলোর অধিকাংশে—প্রায় আশি শতাংশ—সঠিক সমীক্ষা করা হয়নি। তিনি এ কথা আগারগাঁও সমাজসেবা অধিদপ্তরে অনুষ্ঠিত ‘আত্ম-অনুসন্ধান’ ও ‘নবীন‑প্রবীণ কথোপকথন’ শীর্ষক আলোচনার প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্যে তুলে ধরেছেন। এই মন্তব্যের পেছনে রয়েছে তার এক বছরের বেশি আগে সব প্রকল্পের সমীক্ষা চাওয়ার প্রচেষ্টা, যা এখনও ফলপ্রসূ হয়নি।
উল্লেখযোগ্য যে, শারমিনের মতে, বিদেশি তহবিলের মাধ্যমে পরিচালিত প্রকল্পগুলোতে পর্যাপ্ত মনিটরিং ও সমীক্ষা করা হয়েছে, তবে দেশীয় প্রকল্পগুলোতে তা সম্পূর্ণ অনুপস্থিত। তিনি বলেন, বড় প্রকল্পের দ্রুত বাস্তবায়নকালে ফিজিবিলিটি স্টাডি ছাড়া কাজ করা সম্ভব নয়, আর তা না করলে প্রকল্পের টেকসইতা ঝুঁকির মুখে পড়ে। সমীক্ষা না থাকলে প্রকল্পের খরচ, সময়সীমা এবং গুণগত মান নির্ধারণে বড় ঘাটতি দেখা দেয়। ফলে, তিনি জোর দিয়ে বলেন যে, সকল নতুন প্রকল্পের আগে সমীক্ষা এবং পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা বাধ্যতামূলক হওয়া উচিত।
শারমিনের বক্তব্যে বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, কেন্দ্রীয় পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা গড়ে তোলার মাধ্যমে দায়বদ্ধতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা যাবে। তিনি তুলনা করেন যে, বর্তমানে কিছু প্রকল্পে মনিটরিং সিস্টেমের অভাবে কাজগুলো অন্ধকারে চালিয়ে যাওয়া হয়, যা ফলপ্রসূ নয়। একটি সমন্বিত সিস্টেমের মাধ্যমে প্রকল্পের প্রতিটি ধাপের তথ্য রিয়েল‑টাইমে সংগ্রহ করা সম্ভব হবে, যা সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়তা করবে। তিনি এ বিষয়ে সরকারের দ্রুত পদক্ষেপের আহ্বান জানান।
নির্মাণ মানের ওপরও শারমিনের উদ্বেগ প্রকাশ পায়; তিনি উল্লেখ করেন যে, নতুন স্থাপনা কয়েক মাসের মধ্যেই ফাটল দেখা দিচ্ছে। এই ধরনের ত্রুটি শুধুমাত্র ব্যবহারকারীর নিরাপত্তা নয়, আর্থিক ক্ষতিও বাড়িয়ে দেয়। ভবিষ্যতে সব নির্মাণ চুক্তিতে দশ বছরের কাঠামোগত দায়বদ্ধতা ধার্য করা হবে, যাতে ত্রুটি ধরা পড়লে ঠিকাদার নিজস্ব খরচে মেরামত করতে বাধ্য হয়। এই ধারা প্রকল্পের গুণগত মান উন্নত করার পাশাপাশি দায়িত্বশীলতা বাড়াবে।
শারমিন এছাড়াও উল্লেখ করেন যে, দেশের সাম্প্রতিক বিশাল গণঅভ্যুত্থান ও ত্যাগের পরিপ্রেক্ষিতে সরকারকে বঞ্চিত গোষ্ঠীর অধিকার রক্ষা করতে হবে। তিনি বলেন, কর্মসংস্থান প্রতিযোগিতায় সকলের সমান সুযোগ নিশ্চিত করা উচিত, এবং তা মেধার ভিত্তিতে করা হবে। এই নীতি বাস্তবায়নের জন্য নীতি-নিয়মের ব্যাপক সংস্কার প্রয়োজন, যা তিনি সরকারের অগ্রাধিকার হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি আশা প্রকাশ করেন যে, এই পরিবর্তনগুলো সমাজের সমগ্র উন্নয়নে সহায়ক হবে।
উল্লেখ করা দরকার যে, শারমিনের মতে, দেশের সিস্টেমে মৌলিক ঘাটতি রয়েছে এবং ৫৪ বছরের দীর্ঘ শাসনব্যবস্থা বর্তমান চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় অপর্যাপ্ত। তিনি বলেন, শূন্য ভান্ডার পরিস্থিতি মোকাবেলায় নীতি পরিবর্তন ছাড়া অন্য কোনো বিকল্প নেই। এই প্রসঙ্গে তিনি বিভিন্ন ক্ষেত্রের নীতি পুনর্বিবেচনার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছেন। তিনি আশা প্রকাশ করেন যে, সরকার দ্রুত পদক্ষেপ নিয়ে এই সমস্যাগুলো সমাধান করবে।
শারমিনের মন্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় কিছু বিশ্লেষক উল্লেখ করেছেন যে, বিদেশি প্রকল্পে পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা কার্যকর হওয়ায় সেখান থেকে শিখে দেশের প্রকল্পে একই রকম কাঠামো গড়ে তোলা সম্ভব। তবে তারা যুক্তি দেন যে, দেশীয় প্রকল্পের জটিলতা ও ভৌগোলিক বৈচিত্র্যকে বিবেচনা করে পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে সময় ও সম্পদ প্রয়োজন। এই দৃষ্টিকোণ থেকে সরকারকে ধাপে ধাপে পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে হবে।
শারমিনের বক্তব্যে আরও উল্লেখ করা হয়েছে যে, প্রকল্পের ফিজিবিলিটি স্টাডি না থাকলে বিনিয়োগের ঝুঁকি বাড়ে এবং দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক ক্ষতি হতে পারে। তিনি জোর দেন যে, সমীক্ষা ও মনিটরিং ছাড়া কোনো বড় প্রকল্পের অনুমোদন দেওয়া উচিত নয়। এই নীতি অনুসরণ করলে প্রকল্পের সাফল্য ও টেকসইতা নিশ্চিত হবে। তিনি সরকারকে এই দিকটি দ্রুততর করার আহ্বান জানান।
অধিকন্তু, শারমিনের মতে, কেন্দ্রীয় মনিটরিং সিস্টেমের মাধ্যমে প্রকল্পের অগ্রগতি, ব্যয় এবং গুণগত মানের স্বচ্ছতা বৃদ্ধি পাবে। এটি কেবল দায়বদ্ধতা নয়, বরং জনসাধারণের আস্থা বাড়াবে। তিনি উল্লেখ করেন যে, এই সিস্টেমের মাধ্যমে ত্রুটি সনাক্ত হলে তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব হবে। ফলে, প্রকল্পের সময়সীমা ও বাজেটের অতিরিক্ত ব্যয় কমে যাবে।
শারমিনের শেষ মন্তব্যে তিনি দেশের ভবিষ্যৎ দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেছেন; তিনি বলেন, সমতা, meritocracy এবং দায়বদ্ধতা ভিত্তিক নীতি গড়ে তোলা দেশের উন্নয়নের মূল চাবিকাঠি। তিনি আশা প্রকাশ করেন যে, সরকার এই নীতিগুলোকে বাস্তবায়নে অগ্রসর হবে এবং দেশের সামাজিক-অর্থনৈতিক কাঠামোকে শক্তিশালী করবে। তার মতে, এই পরিবর্তনগুলো দেশের দীর্ঘমেয়াদী স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করবে।
সারসংক্ষেপে, শারমিন এস মুরশিদের বক্তব্যে দেশীয় প্রকল্পে সমীক্ষা ও মনিটরিংয়ের অভাব, নির্মাণ মানের সমস্যার সমাধান, এবং কেন্দ্রীয় পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তা স্পষ্ট হয়েছে। তিনি সরকারকে দ্রুত নীতি পরিবর্তন, কাঠামোগত দায়বদ্ধতা এবং সমতা ভিত্তিক কর্মসংস্থান নিশ্চিত করার আহ্বান জানান। এই বিষয়গুলো নিয়ে সরকার কী পদক্ষেপ নেবে তা আগামী সময়ে দেখা যাবে।



