ঢাকা শহরে গত এক সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) সিলিন্ডারের সরবরাহে তীব্র ঘাটতি দেখা দিয়েছে। গৃহস্থালীর চাহিদা বজায় থাকলেও বেশিরভাগ খুচরা দোকানে সিলিন্ডার শূন্য, ফলে গ্রাহকরা একাধিক দোকান ঘুরে ঘুরে বিকল্প খুঁজছেন। যেখানে সিলিন্ডার পাওয়া যায়, সেখানে মূল নির্ধারিত মূল্যের তুলনায় ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা বেশি দিয়ে কিনতে হচ্ছে।
এই ঘাটতি বিশেষ করে মিরপুর ও মোহাম্মদপুরের কিছু পাড়া-প্রতিবেশে তীব্রভাবে অনুভূত হয়েছে। শনিবার সকালে মিরপুরের কালশীর বাসভবনে এক ভাড়াটের গ্যাস শেষ হয়ে যাওয়ার পর, তিনি তিনটি পরিচিত গ্যাস দোকানে ফোন করে জানেন যে কোনো সিলিন্ডার স্টকে নেই। একই সময়ে, রক্ষণাবেক্ষণকারী মনির মিয়া জানান, ভাড়াটের জন্য হোটেল থেকে নাশতা এনে দিতে হয়েছে, কারণ কোনো বিক্রেতা অতিরিক্ত টাকা দিয়ে গ্যাস সরবরাহের প্রস্তাব দেননি।
মিরপুরের ১১ নম্বর সেকশনের এফ ব্লক ও ১২ নম্বর সেকশনের ডি ব্লকে গ্যাস সরবরাহের দায়িত্বে ছিলেন বিনিময় ট্রেডার্সের মালিক হাসান মাহমুদ। তিনি উল্লেখ করেন, তার প্রতিষ্ঠান বসুন্ধরা, ইউনিগ্যাস, পেট্রো ও সেনা সহ বেশ কয়েকটি বড় গ্যাস কোম্পানির পণ্য বিক্রি করে। তবে প্রায় দশ দিন ধরে এই কোম্পানিগুলোর ডিলাররা কোনো সিলিন্ডার সরবরাহ করছেন না, ফলে তার দৈনিক বিক্রয় ১৫‑২০টি থেকে শূন্যে নেমে এসেছে।
হাসান মাহমুদ বলেন, গতকাল তিনি বড় দোকান থেকে তিনটি সিলিন্ডার সংগ্রহ করে প্রত্যেকটি দুই হাজার টাকায় বিক্রি করেছেন, তবে তা ক্রেতার অনুমতি নিয়ে করা হয়েছিল। আজ তিনি উচ্চ মূল্যে বিক্রি বন্ধ করেছেন, কারণ ডিলাররা বাড়তি দামের রসিদ দিচ্ছেন না এবং গ্রাহকরা অতিরিক্ত প্রশ্ন তুলছেন। ফলে তিনি অস্থায়ীভাবে বিক্রয় থামিয়ে রেখেছেন।
মিরপুরের ১০, ১১ ও ১২ নম্বর সেকশনের ছোট ও খুচরা বিক্রেতাদের কাছে গ্যাসের পাইকারি সরবরাহ করে স্পার্ক এনার্জি সলিউশন নামের একটি প্রতিষ্ঠান। এই সংস্থা গ্যাসের চাহিদা মেটাতে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করে, তবে বর্তমান ঘাটতি তাদের সাপ্লাই চেইনকেও প্রভাবিত করেছে।
বাজারে সিলিন্ডার না পাওয়ার ফলে অনেক পরিবার হোটেল বা রেস্তোরাঁ থেকে খাবার কিনে খেতে বাধ্য হয়েছে, যা গৃহস্থালীর ব্যয় বাড়িয়ে তুলেছে। একই সঙ্গে, গ্যাস বিক্রেতারা অতিরিক্ত মূল্যে বিক্রির ঝুঁকি ও গ্রাহকের প্রশ্নের মুখে পড়ে, ফলে অনানুষ্ঠানিক বাজারে লেনদেনের সম্ভাবনা বাড়ছে।
অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা যায়, গ্যাসের সরবরাহে এই ধরণের ব্যাঘাত গৃহস্থালীর দৈনন্দিন ব্যয় কাঠামোকে প্রভাবিত করে এবং মুদ্রাস্ফীতির চাপ বাড়াতে পারে। এছাড়া, গ্যাস বিক্রেতা ও ডিলারদের মধ্যে বিশ্বাসের ফাটল তৈরি হচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে সরবরাহ শৃঙ্খলের স্থায়িত্বকে হুমকির মুখে ফেলতে পারে।
বাজার বিশ্লেষকরা সতর্ক করছেন, যদি ডিলারদের সরবরাহ বন্ধের কারণ দ্রুত সমাধান না হয়, তবে গ্যাসের দামের অতিরিক্ত বৃদ্ধি এবং কালো বাজারের উত্থান ঘটতে পারে। সরকারী নিয়ন্ত্রণের অভাব বা অপ্রতুল তদারকি এই সমস্যাকে আরও বাড়িয়ে তুলতে পারে।
সামগ্রিকভাবে, ঢাকার গ্যাস বাজারে বর্তমান ঘাটতি গ্রাহকের ব্যয় বাড়িয়ে দিচ্ছে, বিক্রেতাদের ব্যবসায়িক ঝুঁকি বাড়াচ্ছে এবং সরবরাহ শৃঙ্খলে অস্থিরতা সৃষ্টি করছে। স্বল্পমেয়াদে গ্যাসের সাপ্লাই পুনরুদ্ধার এবং মূল্য স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা না হলে, গৃহস্থালী ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়িক খাতের উপর নেতিবাচক প্রভাব বাড়তে পারে।



