ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সাম্প্রতিক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে যে, নতুন চালু হওয়া ন্যাশনাল ইকুইপমেন্ট আইডেন্টিটি রেজিস্টার (NEIR) সিস্টেমে দেশব্যাপী অসংখ্য নকল ও ক্লোন আইইএমইআই নম্বর সনাক্ত হয়েছে। এই নম্বরগুলো মোবাইল নেটওয়ার্কে সক্রিয় অবস্থায় রয়েছে এবং তাদের সংখ্যা লক্ষ লক্ষের অঙ্কে পৌঁছেছে।
বিশেষ করে ১ জানুয়ারি থেকে বিটিআরসির তত্ত্বাবধানে চালু করা NEIR সিস্টেমের মাধ্যমে প্রথমবারের মতো এই ধরনের জালিয়াতি প্রকাশ পেয়েছে। সিস্টেমে ‘1111111111111’, ‘0000000000000’ এবং ‘9999999999999’ এর মতো স্পষ্টভাবে কৃত্রিম আইইএমইআই নম্বরগুলো সক্রিয় অবস্থায় পাওয়া গেছে। এসব নম্বর ব্যবহার করে একাধিক হ্যান্ডসেট নেটওয়ার্কে সংযুক্ত রয়েছে, যা দেশের মোবাইল অবকাঠামোর স্বচ্ছতাকে চ্যালেঞ্জ করে।
আইইএমইআই (ইন্টারন্যাশনাল মোবাইল ইকুইপমেন্ট আইডেন্টিটি) হল প্রতিটি মোবাইল ফোন ও সিম-সক্ষম ডিভাইসের জন্য নির্ধারিত ১৫ অঙ্কের অনন্য পরিচয় নম্বর। এই নম্বরের মাধ্যমে নেটওয়ার্ক অপারেটর ও নিয়ন্ত্রক সংস্থা ডিভাইসকে সিম কার্ডের উপস্থিতি না থাকলেও আলাদা করে চিহ্নিত করতে পারে। তবে বর্তমানে নকল আইইএমইআই ব্যবহারকারী ডিভাইসের সংখ্যা বাড়ার ফলে সঠিক শনাক্তকরণে বাধা সৃষ্টি হচ্ছে।
বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়েছে যে, সরকার এই নকল ডিভাইসগুলোকে অবিলম্বে বন্ধ করার পরিবর্তে সাময়িকভাবে ‘গ্রে লিস্ট’ এ রাখছে। এর মূল উদ্দেশ্য হল জনসাধারণের দৈনন্দিন যোগাযোগে কোনো বাধা না সৃষ্টি করা, একই সঙ্গে ভবিষ্যতে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য তথ্য সংগ্রহ করা। গ্রে লিস্টে থাকা নম্বরগুলোকে পর্যবেক্ষণ করে প্রয়োজনীয় সময়ে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নকল আইইএমইআই শুধুমাত্র স্মার্টফোনেই সীমাবদ্ধ নয়; ইন্টারনেট অফ থিংস (IoT) ডিভাইসেও এই ধরনের নম্বরের উপস্থিতি বাড়ছে। বর্তমানে মোবাইল অপারেটররা স্মার্টফোন, সিম-চালিত অন্যান্য ডিভাইস এবং IoT ডিভাইসের আইইএমইআই আলাদা করে শনাক্ত করতে সক্ষম নয়। ফলে নকল আইইএমইআই ব্যবহারকারী ডিভাইসগুলো নেটওয়ার্কে প্রবেশ করে সেবা গ্রহণ করতে পারে, যা নিরাপত্তা ও নেটওয়ার্কের স্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকি তৈরি করে।
এই সমস্যার সমাধানে সরকার নতুন একটি পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। এখন থেকে বৈধভাবে আমদানিকৃত IoT ডিভাইসগুলোকে আলাদা ট্যাগ বা চিহ্ন দিয়ে রেজিস্টার করা হবে, যাতে সেগুলোকে নকল আইইএমইআই থেকে পৃথক করা যায়। তদুপরি, কর্তৃপক্ষ ইতিমধ্যে কিছু নকল আইইএমইআই নম্বরের তালিকা প্রকাশ করেছে, যেগুলোর একেকটি নম্বরের মাধ্যমে এক লক্ষের বেশি মোবাইল ফোন সক্রিয় রয়েছে। এই তথ্য থেকে স্পষ্ট হয় যে, নকল আইইএমইআই ভিত্তিক মোবাইল জালিয়াতি দেশের টেলিকম সেক্টরে কতটা গভীরভাবে প্রবেশ করেছে।
বৈধ ডিভাইসের প্রবেশ নিশ্চিত করতে এবং নকল ডিভাইসের ব্যবহার কমাতে সরকার ও টেলিকম অপারেটরদের সমন্বিত কাজের প্রয়োজন। NEIR সিস্টেমের ধারাবাহিক পর্যবেক্ষণ ও গ্রে লিস্টের কার্যকর ব্যবহার নকল ডিভাইসের সংখ্যা কমাতে সহায়তা করবে বলে আশা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে, ভোক্তাদের সচেতনতা বৃদ্ধি এবং নকল ডিভাইস কেনার ঝুঁকি সম্পর্কে তথ্য প্রদানও গুরুত্বপূর্ণ।
সারসংক্ষেপে, NEIR সিস্টেমের সূচনা দেশের মোবাইল নেটওয়ার্কে নকল ও ক্লোন আইইএমইআই সমস্যার প্রকৃত মাত্রা উন্মোচন করেছে। সরকার গ্রে লিস্টের মাধ্যমে তাত্ক্ষণিক বাধা না দিয়ে পর্যবেক্ষণ চালিয়ে যাবে, আর ভবিষ্যতে বৈধ IoT ডিভাইসের আলাদা ট্যাগিং ও নকল আইইএমইআই তালিকার প্রকাশের মাধ্যমে জালিয়াতি দমন করা হবে। এই পদক্ষেপগুলো টেলিকম অবকাঠামোর স্বচ্ছতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।



