ভেনেজুয়েলা প্রতিরক্ষা মন্ত্রী ভ্লাদিমির পাদ্রিনো লোপেজ দেশের সামরিক বাহিনীর সমন্বয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক আক্রমণের প্রতিক্রিয়ায় সমগ্র জাতির ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধের আহ্বান জানিয়েছেন। লোপেজ উল্লেখ করেন, যুক্তরাষ্ট্রের এই পদক্ষেপকে “সবচেয়ে ন্যাক্কারজনক আগ্রাসন” বলে বর্ণনা করে, এবং মাদুরোর নির্দেশ অনুসরণ করে দেশের সকল সশস্ত্র বাহিনীকে দেশব্যাপী মোতায়েনের নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি যোগ করেন, “তারা আমাদের আক্রমণ করেছে, তবে তারা আমাদের দমন করতে পারবে না,” এভাবে ভেনেজুয়েলীয় নেতৃত্বের দৃঢ়তা প্রকাশ করা হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও নিজের সামাজিক নেটওয়ার্কে এই ঘটনার স্বীকৃতি দিয়েছেন। ট্রাম্পের পোস্টে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলায় বৃহৎ পরিসরে সফল সামরিক অভিযান চালিয়েছে এবং দেশের প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ও তার স্ত্রীকে গ্রেফতার করে দেশ থেকে বহিষ্কার করেছে। তিনি উল্লেখ করেন, এই অভিযানটি যুক্তরাষ্ট্রের আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সঙ্গে সমন্বয়ে পরিচালিত হয়েছে এবং বিস্তারিত তথ্য পরবর্তীতে প্রকাশ করা হবে। ট্রাম্পের পোস্টে শনিবার স্থানীয় সময় ১১ টায় মার-এ-লাগোতে একটি সংবাদ সম্মেলনের আয়োজনের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
ভেনেজুয়েলা সরকার পূর্বে একটি আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে যুক্তরাষ্ট্রের আক্রমণকে সরাসরি “সামরিক আগ্রাসন” হিসেবে চিহ্নিত করে, এবং উল্লেখ করেছে যে যুক্তরাষ্ট্র দেশের বেশ কয়েকটি রাজ্যে, যার মধ্যে রাজধানী কারাকাস, মিরান্ডা, আরাগুয়া ও লা গুইরার অন্তর্ভুক্ত, সিভিল ও সামরিক অবকাঠামোতে হামলা চালিয়েছে। সরকার দাবি করে, যুক্তরাষ্ট্রের মূল উদ্দেশ্য ভেনেজুয়েলার তেল ও খনিজ সম্পদ দখল করা, তবে এই পরিকল্পনা সফল হবে না।
আঞ্চলিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার রিপোর্ট অনুসারে, কারাকাসের সরকার যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে তীব্র অভিযোগ উত্থাপন করেছে এবং বলেছে, যুক্তরাষ্ট্রের এই পদক্ষেপ ভেনেজুয়েলার সার্বভৌমত্বের সরাসরি লঙ্ঘন। তদুপরি, প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো সারাদেশে জাতীয় জরুরি অবস্থা ঘোষণা করে, যা দেশের নিরাপত্তা ও শাসন ব্যবস্থার উপর প্রভাব ফেলবে।
যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল এভিয়েশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (FAA) ভেনেজুয়েলার আকাশসীমা ব্যবহারকারী বাণিজ্যিক বিমানগুলোর ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। FAA এই নিষেধাজ্ঞাকে “চলমান সামরিক তৎপরতা” হিসেবে উল্লেখ করেছে, যা কারাকাসে ধারাবাহিক বিস্ফোরণের পরপরই জারি করা হয়। এই পদক্ষেপটি আন্তর্জাতিক বিমান চলাচল ও বাণিজ্যিক সংযোগে উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলবে।
বিশ্লেষকরা উল্লেখ করছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ভেনেজুয়েলার মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক উত্তেজনা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তীব্রতর হয়েছে। ২০১৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা এবং ভেনেজুয়েলার তেল রপ্তানি সীমাবদ্ধতা উভয় পক্ষের সম্পর্ককে আরও খারাপ করেছে। বর্তমান সংঘাতের ফলে ভেনেজুয়েলার তেল ও খনিজ সম্পদের ওপর আন্তর্জাতিক বাজারের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তিত হতে পারে, যা অঞ্চলের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতায় প্রভাব ফেলবে।
অন্যদিকে, আন্তর্জাতিক কূটনীতিকরা সতর্ক করছেন যে, এই ধরনের সামরিক সংঘর্ষ লাতিন আমেরিকায় নিরাপত্তা পরিবেশকে অস্থির করতে পারে। তারা জোর দিয়ে বলছেন, সংলাপ ও কূটনৈতিক সমাধানই দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার একমাত্র উপায়। যুক্তরাষ্ট্রের এই আক্রমণ এবং ভেনেজুয়েলার প্রতিক্রিয়া উভয়ই আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নজরে রয়েছে, এবং পরবর্তী কয়েক দিনের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের পরিকল্পিত সংবাদ সম্মেলন ও ভেনেজুয়েলার জাতীয় জরুরি অবস্থা সংক্রান্ত পদক্ষেপগুলো গ্লোবাল নীতি নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
এই পরিস্থিতিতে, আন্তর্জাতিক সংস্থা ও প্রতিবেশী দেশগুলো উভয় পক্ষের সঙ্গে সংলাপের আহ্বান জানাচ্ছে, যাতে অতিরিক্ত সামরিক পদক্ষেপ এড়িয়ে চলা যায় এবং মানবিক সংকটের সম্ভাবনা কমে। ভেনেজুয়েলার সামরিক মোতায়েন ও যুক্তরাষ্ট্রের আকাশসীমা নিষেধাজ্ঞা উভয়ই অঞ্চলের নিরাপত্তা কাঠামোকে পুনর্বিবেচনার প্রয়োজনীয়তা নির্দেশ করে। ভবিষ্যতে, যুক্তরাষ্ট্রের আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সঙ্গে সমন্বিত এই অভিযান কীভাবে শেষ হবে এবং ভেনেজুয়েলার সরকার কীভাবে দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা করবে, তা আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের দৃষ্টিতে থাকবে।



