যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বিমানবাহিনীর ভেনেজুয়েলা উপর আকাশ আক্রমণকে ইরান সরকার সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘনকারী আগ্রাসন হিসেবে চিহ্নিত করেছে এবং জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদকে তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ নিতে আহ্বান জানিয়েছে। এই বিবৃতি ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় শনি, ৩ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখে প্রকাশ করে, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের কাজকে আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তার স্পষ্ট লঙ্ঘন হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। ইরান যুক্তরাষ্ট্রকে অনুরোধ করেছে যে, ভেনেজুয়েলা সরকারের স্বায়ত্তশাসন রক্ষার জন্য অবিলম্বে আক্রমণ বন্ধ করুক।
মন্ত্রণালয়ের ঘোষণায় বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের এই সামরিক হস্তক্ষেপ আন্তর্জাতিক চুক্তি, বিশেষ করে জাতিসংঘের চ্যার্টারকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করে। ভেনেজুয়েলা একটি স্বাধীন রাষ্ট্র, যার আঞ্চলিক অখণ্ডতা আন্তর্জাতিক আইনের অধীনে সুরক্ষিত, এবং কোনো বহিরাগত সামরিক হস্তক্ষেপ তা ভঙ্গের সমান। ইরান যুক্তরাষ্ট্রের কাজকে আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক শান্তির জন্য গুরুতর হুমকি হিসেবে তুলে ধরেছে।
বিবৃতিতে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের এই আক্রমণ আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার ওপর আস্থা ক্ষয় করে এবং বৈশ্বিক নিরাপত্তা কাঠামোর স্থিতিশীলতাকে দুর্বল করে। ইরান যুক্তরাষ্ট্রকে সতর্ক করেছে যে, এ ধরনের অবৈধ কর্ম আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সমগ্র ন্যায়বিচার ব্যবস্থাকে প্রভাবিত করবে এবং ভবিষ্যতে আরও অনধিকারিক হস্তক্ষেপের পথ প্রশস্ত করতে পারে।
ইরান সরকার ভেনেজুয়েলা সরকারের স্ব-রক্ষার অধিকারকে জোর দিয়ে বলেছে, এবং সকল জাতিসংঘ সদস্যকে এই আক্রমণের স্পষ্ট নিন্দা জানাতে এবং দায়ী পক্ষকে আন্তর্জাতিক আদালতে আনার আহ্বান জানিয়েছে। মন্ত্রণালয় উল্লেখ করেছে, আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘনকারী কোনো রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে সমন্বিত পদক্ষেপ না নিলে বিশ্ব শৃঙ্খলা ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
এই অভিযোগের পটভূমিতে যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক সামরিক কার্যক্রমের ধারাবাহিকতা রয়েছে। গত বছরই ক্যারিবিয়ান সাগরে যুক্তরাষ্ট্রের বিমানবাহিনীর মাদকবাহী নৌযানে আক্রমণ ঘটায় ছয়জনের মৃত্যু হয়, যা আন্তর্জাতিক সমালোচনার মুখে পড়েছিল। একই সময়ে, যুক্তরাষ্ট্রের অন্যান্য ল্যাটিন আমেরিকান দেশে হস্তক্ষেপের অভিযোগও উঠে এসেছে, যা ইরানের এই পদক্ষেপের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
বিশ্বের প্রধান কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা ইরানের এই নিন্দাকে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সম্পর্কের বর্তমান উত্তেজনার একটি নতুন স্তর হিসেবে ব্যাখ্যা করছেন। তারা উল্লেখ করেন, যুক্তরাষ্ট্রের ল্যাটিন আমেরিকায় সামরিক উপস্থিতি এবং ইরানের মধ্যপ্রাচ্যের কূটনৈতিক জোটের মধ্যে টানাপোড়েন বাড়ছে, এবং এই ঘটনা দুই দেশের মধ্যে চলমান পারমাণবিক চুক্তি আলোচনাকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।
ইরানের এই পদক্ষেপের ফলে যুক্তরাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক অবস্থানেও চাপ বাড়তে পারে। যদি নিরাপত্তা পরিষদে কোনো সমর্থনমূলক রেজোলিউশন গৃহীত হয়, তবে যুক্তরাষ্ট্রের ল্যাটিন আমেরিকায় সামরিক নীতি পুনর্বিবেচনা করতে হতে পারে। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশগুলো এই বিষয়টি কীভাবে মোকাবেলা করবে, তা ভবিষ্যৎ কূটনৈতিক সমঝোতার ওপর নির্ভরশীল।
জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে এই বিষয়টি নিয়ে জরুরি বৈঠকের আহ্বান করা হয়েছে। মন্ত্রণালয় দাবি করেছে যে, পরিষদকে দ্রুত একটি রেজোলিউশন প্রস্তাব করতে হবে, যাতে যুক্তরাষ্ট্রের আক্রমণ বন্ধের নির্দেশনা এবং ভেনেজুয়েলার স্বায়ত্তশাসন রক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নির্ধারিত হয়। রেজোলিউশনের অনুমোদন প্রক্রিয়া সাধারণত পাঁচ দিনের মধ্যে শেষ হয়, তবে নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্যদের ভেটো ক্ষমতা বিষয়টি জটিল করে তুলতে পারে।
ইরানের এই নিন্দা আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় ব্যাপক আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে। বেশ কয়েকটি আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা এই ঘটনাকে যুক্তরাষ্ট্রের ল্যাটিন আমেরিকায় সামরিক নীতি এবং আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি সম্মানজনক দায়িত্বের প্রশ্ন হিসেবে তুলে ধরেছে। একই সঙ্গে, ভেনেজুয়েলা সরকারও যুক্তরাষ্ট্রের আক্রমণকে অবৈধ বলে ঘোষণা করেছে এবং আন্তর্জাতিক সমর্থন চাইছে।
ভৌগোলিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা যায়, ভেনেজুয়েলা দক্ষিণ আমেরিকার একটি কৌশলগত অবস্থানে রয়েছে, যেখানে তেল ও গ্যাসের সমৃদ্ধি রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের এই হস্তক্ষেপ যদি দীর্ঘস্থায়ী হয়, তবে অঞ্চলের রাজনৈতিক ভারসাম্যহীনতা বাড়তে পারে এবং অন্যান্য প্রতিবেশী দেশগুলোর নিরাপত্তা নীতিতে প্রভাব ফেলতে পারে। ইরান এই সম্ভাব্য পরিণতি উল্লেখ করে, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে সতর্ক করেছে যে, একক রাষ্ট্রের অবৈধ সামরিক কাজ পুরো মহাদেশের স্থিতিশীলতাকে ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে।
বিশ্লেষকরা আরও উল্লেখ করেন, যদি নিরাপত্তা পরিষদে রেজোলিউশন গৃহীত হয়, তবে যুক্তরাষ্ট্রকে আন্তর্জাতিক আইনের অধীনে দায়বদ্ধ করা সম্ভব হতে পারে, যা তার বৈশ্বিক কূটনৈতিক সম্পর্কের ওপর প্রভাব ফেলবে। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য পাল্টা পদক্ষেপ, যেমন ভেটো ব্যবহার, এই সংঘাতকে আরও জটিল করে তুলতে পারে এবং আন্তর্জাতিক আইনের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উত্থাপন করবে।
ইরান সরকার এই মুহূর্তে যুক্তরাষ্ট্রকে স্পষ্টভাবে জানিয়েছে যে, ভেনেজুয়েলার উপর কোনো সামরিক হস্তক্ষেপ অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে এবং আন্তর্জাতিক আইনের অধীনে দায়িত্ব গ্রহণ করতে হবে। মন্ত্রণালয় জোর দিয়ে বলেছে, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে একত্রে কাজ করে এই ধরনের অবৈধ কর্মকে থামাতে হবে, নতুবা বৈশ্বিক শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা বিপন্ন হবে।
এই বিবৃতি এবং আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্রের ল্যাটিন আমেরিকায় সামরিক নীতি, ইরানের কূটনৈতিক কৌশল এবং বৈশ্বিক নিরাপত্তা কাঠামোর পুনর্গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। উভয় পক্ষের মধ্যে চলমান কূটনৈতিক সংলাপের ফলাফলই নির্ধারণ করবে, এই সংঘাতের পরবর্তী ধাপ কী হবে এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় কীভাবে সমন্বিতভাবে প্রতিক্রিয়া জানাবে।



