মার্চের প্রথম সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ভেনেজুয়েলার রাজধানী ক্যারাকাসে আকাশীয় আক্রমণ চালানোর নির্দেশ দেন। হোয়াইট হাউসের একজন কর্মকর্তা সিবিএসকে জানিয়ে বলেন যে অপারেশনটি পরিকল্পিত এবং কার্যকর হয়েছে। এই পদক্ষেপের ফলে ভেনেজুয়েলা সরকার জরুরি অবস্থা ঘোষণা করে এবং নিরাপত্তা সংস্থাগুলোকে সতর্ক করে।
ভেনেজুয়েলা সরকার যুক্তরাষ্ট্রের এই আক্রমণকে অবৈধ এবং আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন হিসেবে চিহ্নিত করেছে। ক্যারাকাসে লক্ষ্যবস্তু স্থানে সুনির্দিষ্ট ক্ষতি হয়েছে বলে সরকার জানায়, যদিও সুনির্দিষ্ট ক্ষতির পরিমাণ প্রকাশ করা হয়নি।
সেই একই দিনে কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট গুস্তাভো পেট্রো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একটি বিবৃতি প্রকাশ করেন। তিনি একপক্ষীয় সামরিক পদক্ষেপকে কঠোরভাবে প্রত্যাখ্যান করে বলেন যে, যুক্তরাষ্ট্রের এমন আচরণ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে এবং ভেনেজুয়েলার সাধারণ জনগণকে ঝুঁকিতে ফেলতে পারে। পেট্রো উল্লেখ করেন যে, কলম্বিয়া প্রতিবেশী দেশের ঘটনাকে গভীর উদ্বেগের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করছে এবং সকল পক্ষকে সংঘাত এড়াতে আহ্বান জানাচ্ছেন।
কিউবার প্রেসিডেন্ট মিগুয়েল দিয়াজ-ক্যানেলও একই দিনে যুক্তরাষ্ট্রের আক্রমণকে অপরাধমূলক কার্যক্রম হিসেবে বর্ণনা করেন। তিনি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া দাবি করে বলেন যে, কিউবা এই অপরাধমূলক হামলার তীব্র নিন্দা জানাচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের এই একপক্ষীয় পদক্ষেপের পর আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর দৃষ্টিতে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের হোয়াইট হাউসের অফিসিয়াল মন্তব্যে বলা হয়েছে যে, অপারেশনটি ভেনেজুয়েলার নিরাপত্তা হুমকি মোকাবেলায় প্রয়োজনীয় ছিল, তবে কোনো স্পষ্ট ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি যে লক্ষ্যবস্তু কী ছিল।
অঞ্চলীয় বিশ্লেষকরা উল্লেখ করছেন যে, এই ধরনের সামরিক হস্তক্ষেপ লাতিন আমেরিকায় অতীতের কূটনৈতিক উত্তেজনার পুনরাবৃত্তি হতে পারে। বিশেষ করে, ২০১৯ সালে ভেনেজুয়েলায় যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা এবং সামরিক প্রশিক্ষণ প্রোগ্রামগুলোকে স্মরণ করা হয়। বর্তমান পরিস্থিতি এই ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
অমেরিকান সেন্টার ফর পলিসি স্টাডিজের একজন বিশ্লেষক উল্লেখ করেন যে, যুক্তরাষ্ট্রের এই পদক্ষেপে ভেনেজুয়েলার সরকারকে দুর্বল করা এবং তার রাজনৈতিক প্রভাবকে সীমাবদ্ধ করা লক্ষ্য থাকতে পারে। তবে তিনি সতর্ক করেন যে, একপক্ষীয় সামরিক হস্তক্ষেপ আন্তর্জাতিক আইনের অধীনে বৈধতা পেতে পারবে না যদি তা জাতিসংঘের অনুমোদন ছাড়া করা হয়।
ভেনেজুয়েলার সরকার জরুরি অবস্থা ঘোষণার পর দেশীয় নিরাপত্তা বাহিনীর মোবিলাইজেশন বাড়িয়ে দেয়। ক্যারাকাসের কিছু অংশে সাময়িক রোডব্লক এবং বেসামরিক নাগরিকদের চলাচল সীমিত করা হয়েছে। সরকার আন্তর্জাতিক মানবিক সংস্থাগুলোর সহায়তা চেয়ে আহ্বান জানিয়েছে।
অন্যদিকে, লাতিন আমেরিকান স্টেটস অর্গানাইজেশন (OAS) এর গোপনীয়তা রক্ষাকারী কমিটি এই ঘটনার ওপর জরুরি বৈঠকের আহ্বান জানিয়েছে। সদস্য দেশগুলোকে একত্রিত হয়ে যুক্তরাষ্ট্রের পদক্ষেপের আইনি ভিত্তি এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তার ওপর প্রভাব নিয়ে আলোচনা করতে হবে বলে তারা জোর দিয়েছে।
জাতিসংঘের সিকিউরিটি কাউন্সিলেও এই বিষয়টি উত্থাপিত হয়েছে। কিছু সদস্য রাষ্ট্র যুক্তরাষ্ট্রের একপক্ষীয় সামরিক হস্তক্ষেপকে আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তার হুমকি হিসেবে বিবেচনা করে রেজোলিউশন প্রস্তাবের কথা বলছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের ভেটো ক্ষমতা এই প্রক্রিয়াকে জটিল করে তুলতে পারে।
অবশেষে, আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা উল্লেখ করছেন যে, এই ঘটনার পর ভেনেজুয়েলা-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের পুনরায় মূল্যায়ন হবে। বাণিজ্যিক ও কূটনৈতিক চ্যানেলগুলোতে নতুন শর্ত আরোপের সম্ভাবনা রয়েছে, যা লাতিন আমেরিকায় বৃহত্তর ভূ-রাজনৈতিক পুনর্গঠনকে ত্বরান্বিত করতে পারে।
এই পরিস্থিতিতে, কলম্বিয়া ও কিউবার মতো প্রতিবেশী দেশগুলো তাদের কূটনৈতিক অবস্থান দৃঢ় করে আন্তর্জাতিক সমর্থন সংগ্রহের চেষ্টা করছে। উভয় দেশই যুক্তরাষ্ট্রের একপক্ষীয় পদক্ষেপকে আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন হিসেবে চিহ্নিত করে, এবং আঞ্চলিক শান্তি রক্ষার জন্য সমন্বিত প্রতিক্রিয়া দাবি করছে।



