মার্কিন সরকারি সূত্র নিশ্চিত করেছে যে লাতিন আমেরিকার দেশ ভেনেজুয়েলার রাজধানী কারাকাসে এবং তার পার্শ্ববর্তী রাজ্যগুলোতে সাম্প্রতিক বিমান হামলা ঘটেছে। হুমকির স্বীকৃতি দেওয়া সত্ত্বেও, যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা তৎক্ষণাৎ আক্রমণের বিশদ প্রকাশ করেননি।
ভেনেজুয়েলা সরকার একটি আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে উল্লেখ করেছে যে যুক্তরাষ্ট্রের বিমানগুলো কারাকাসের পাশাপাশি মিরান্ডা, আরাগুয়া এবং লা গুইরায় অবস্থিত বেসামরিক ও সামরিক স্থাপনা লক্ষ্যবস্তু করে আক্রমণ চালিয়েছে। সরকার এই কর্মকাণ্ডকে সরাসরি ‘সামরিক আগ্রাসন’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
কারাকাসের সরকার যুক্তরাষ্ট্রের উদ্দেশ্যকে ভেনেজুয়েলার তেল ও খনিজ সম্পদ দখল করা হিসেবে ব্যাখ্যা করেছে এবং জোর দিয়ে বলেছে যে এই ধরনের কোনো প্রচেষ্টা সফল হবে না। একই সঙ্গে, দেশের প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো সারাদেশে জাতীয় জরুরি অবস্থা ঘোষণা করে নিরাপত্তা ব্যবস্থা শক্তিশালী করার নির্দেশ দিয়েছেন।
মার্কিন ফেডারেল এভিয়েশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (FAA) পূর্বে ভেনেজুয়েলার আকাশসীমায় বাণিজ্যিক উড়ান নিষিদ্ধ করে ‘চলমান সামরিক তৎপরতা’ হিসেবে উল্লেখ করেছিল। এই নিষেধাজ্ঞার পরপরই কারাকাসে অন্তত সাতটি বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়, যা স্থানীয় সূত্রে আকাশে আক্রমণের সূচক হিসেবে বিবেচিত হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দীর্ঘদিন ধরে ভেনেজুয়েলার সরকারকে মাদক পাচার ও অবৈধ অভিবাসনের উৎস হিসেবে অভিযুক্ত করে আসছেন। তিনি দাবি করেন যে যুক্তরাষ্ট্রের কোনো সামরিক পদক্ষেপের মূল লক্ষ্য মাদক চোরাচালান বন্ধ করা। অন্যদিকে, মাদুরো ট্রাম্পের নীতি ভেনেজুয়েলাকে উপনিবেশিক শাসনে পরিণত করার প্রচেষ্টা হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন, বিশেষ করে দেশের বিশাল জীবাশ্ম জ্বালানি সম্পদের দিকে নজর দিয়ে।
আঞ্চলিক বিশ্লেষকরা উল্লেখ করছেন যে এই ঘটনার ফলে ভেনেজুয়েলা-যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক সম্পর্ক আরও খারাপ হতে পারে এবং লাতিন আমেরিকায় যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি নিয়ে বিতর্ক তীব্র হবে। তারা আরও সতর্ক করছেন যে, যদি যুক্তরাষ্ট্রের আক্রমণকে ‘সামরিক আগ্রাসন’ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয়, তবে আন্তর্জাতিক সংস্থা ও প্রতিবেশী দেশগুলো থেকে শাস্তিমূলক পদক্ষেপের সম্ভাবনা বাড়বে।
অন্যদিকে, ভেনেজুয়েলার প্রতিবেশী দেশগুলো ইতিমধ্যে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে এবং আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর হস্তক্ষেপের আহ্বান জানাচ্ছে। বিশেষ করে, ক্যারিবিয়ান কমিউনিটি (CARICOM) এবং অর্গানাইজেশন অব আমেরিকান স্টেটস (OAS) উভয়ই শান্তিপূর্ণ সমাধানের জন্য কূটনৈতিক আলোচনার প্রস্তাব দিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের দিক থেকে এখনো কোনো সরকারি মন্তব্য প্রকাশিত হয়নি, যদিও এয়ার ফোর্স ও ডিপার্টমেন্ট অব ডিফেন্সের কিছু উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা অপ্রকাশ্য সূত্রে আক্রমণের বৈধতা ও লক্ষ্য সম্পর্কে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছেন।
ভেনেজুয়েলার সরকার আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় জানিয়েছে যে, তারা যুক্তরাষ্ট্রের এই আক্রমণকে আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন হিসেবে গণ্য করবে এবং যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে কূটনৈতিক পদক্ষেপ গ্রহণের সম্ভাবনা রয়েছে।
বিশ্বব্যাপী পর্যবেক্ষকরা উল্লেখ করছেন যে, ২০২৪ সালের ভেনেজুয়েলা নির্বাচনে মাদুরোর বিজয়কে যুক্তরাষ্ট্রসহ কিছু দেশ স্বীকৃতি দেয়নি, যা ইতিমধ্যে দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা বাড়িয়ে দিয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে, বর্তমান আক্রমণকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যযুক্ত পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা ভবিষ্যৎ মাইলস্টোন হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য অতিরিক্ত নিষেধাজ্ঞা, ভেনেজুয়েলার জাতীয় জরুরি অবস্থা বর্ধন এবং জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে বিষয়টি উত্থাপনের সম্ভাবনা উল্লেখ করছেন। তারা আরও বলছেন যে, পরবর্তী কয়েক সপ্তাহে উভয় পক্ষের কূটনৈতিক নেটওয়ার্কে তীব্র আলোচনার সম্ভাবনা রয়েছে।
এই ঘটনায় ভেনেজুয়েলার জনগণ উদ্বেগের মুখে রয়েছে, বিশেষ করে কারাকাসে বিস্ফোরণের ফলে সৃষ্ট ধ্বংসাবশেষ ও নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণে। সরকার জরুরি সেবা ও চিকিৎসা সহায়তা প্রদান করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কাজ করছে।
সারসংক্ষেপে, যুক্তরাষ্ট্রের বিমান হামলা ভেনেজুয়েলার রাজধানী ও পার্শ্ববর্তী রাজ্যগুলোতে ঘটেছে, যা ভেনেজুয়েলার সরকারকে জাতীয় জরুরি অবস্থা ঘোষণা করতে বাধ্য করেছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টি এখন এই সংঘাতের কূটনৈতিক সমাধান ও সম্ভাব্য পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে নিবদ্ধ।



