গঙ্গা নদীর জলবণ্টন চুক্তির মেয়াদ ২০২৬ সালে শেষ হতে চলেছে, আর জুলাই ২০২৪-এ বাংলাদেশের রাজনৈতিক উত্থান-পতনের পর দেশের জল নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনা নতুন মাত্রা পেয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ার জলের ব্যবহার ও ভাগাভাগি এখন কেবল পরিবেশগত বিষয় নয়, বরং উচ্চ-ঝুঁকিপূর্ণ ভূ-রাজনৈতিক প্রশ্নে রূপান্তরিত হয়েছে।
পূর্বে ২০০৮ সালে স্বাক্ষরিত গঙ্গা জলবণ্টন চুক্তি, ভারত ও বাংলাদেশকে নির্দিষ্ট পরিমাণে গঙ্গা জলের ভাগ নির্ধারণ করেছিল। তবে চুক্তির শর্তে ভারতকে উপরের অংশে অধিক সুবিধা দেওয়া হয়েছে, ফলে বাংলাদেশের নিম্নভাগে জল প্রবাহের পরিমাণে প্রায়ই হ্রাস দেখা যায়। এই পরিস্থিতি দেশীয় কৃষি, মৎস্য ও পানীয় জলের সরবরাহে সরাসরি প্রভাব ফেলে।
গত ষোলো বছর ধরে বাংলাদেশ সরকার, বিশেষ করে পূর্বের ভারত-সমর্থিত শাসনকালে, ভারতের কূটনৈতিক সমর্থন বজায় রাখতে চুক্তির লঙ্ঘন বা একতরফা পরিবর্তনের বিষয়টি তুচ্ছ করে দেখেছে। ফলে দেশের জল নীতি প্রায়ই উপরের দেশের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখতে বাধ্য হয়েছে, যা দীর্ঘমেয়াদে পরিবেশগত দুর্বলতা বাড়িয়ে তুলেছে।
জুলাই ২০২৪-এ ঘটিত গণবিপ্লবের ফলে সরকার পরিবর্তন হয়েছে এবং দেশের অভ্যন্তরে জলসম্পদকে কেবল একটি সম্পদ নয়, জাতীয় স্বায়ত্তশাসনের মূল স্তম্ভ হিসেবে দেখা শুরু হয়েছে। নতুন শাসনকালে তরুণ আন্দোলন ও নাগরিক সমাজের চাপ বাড়ছে, যাতে জল শাসনকে ঔপনিবেশিক কাঠামো থেকে মুক্ত করে স্বতন্ত্রভাবে পরিচালনা করা যায়।
এই পরিবর্তনের মূল চালিকাশক্তি হল জলকে রাজনৈতিক প্রভাবের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা নিয়ে ব্যাপক অসন্তোষ। জনগণ এখন দাবি করছে যে, গঙ্গা ও অন্যান্য ভাগাভাগি নদীর জলকে পরিবেশগত সাধারণ সম্পদ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে, উভয় দেশের স্বার্থের সমতা রক্ষা করা উচিত।
ইন্ডিয়ার দৃষ্টিকোণ থেকে গঙ্গা চুক্তি একটি স্থিতিশীল কাঠামো, যা দেশের কৃষি ও শিল্পের জন্য অপরিহার্য জল সরবরাহ নিশ্চিত করে। ভারত সরকার চুক্তির মেয়াদ শেষের আগে পুনরায় আলোচনা না হলে, জলের প্রবাহে অনিয়মিততা ও সম্ভাব্য সংকটের মুখোমুখি হতে পারে বলে সতর্কতা প্রকাশ করেছে।
বাংলাদেশের নতুন সরকার, যদিও এখনও আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে ভারসাম্য রক্ষা করতে চায়, তবু জল নীতি পুনর্গঠন ও স্বতন্ত্র জলের অধিকার নিশ্চিত করার জন্য কূটনৈতিক চাপ বাড়াচ্ছে। সরকারী সূত্রে বলা হয়েছে, গঙ্গা চুক্তির পুনঃপর্যালোচনা প্রক্রিয়ায় পরিবেশগত ন্যায়বিচার ও জলসম্পদের সমবায় ব্যবস্থাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।
অধিকন্তু, দেশের অভ্যন্তরে জল সংরক্ষণ, বৃষ্টির পানি সংগ্রহ ও নদীর তীরবর্তী পুনর্গঠনের জন্য নীতি প্রণয়ন চলছে। এসব উদ্যোগের লক্ষ্য হল দেশের জলভিত্তিক অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য নিরাপদ জল সরবরাহ নিশ্চিত করা।
আঞ্চলিক পর্যায়ে, দক্ষিণ এশিয়া জল ফোরাম ও অন্যান্য বহুপাক্ষিক সংস্থা গঙ্গা চুক্তির পুনরায় আলোচনা ও নতুন শেয়ারিং মডেল গড়ে তোলার জন্য মধ্যস্থতা করতে পারে। তবে এই প্রক্রিয়ায় উভয় দেশের রাজনৈতিক ইচ্ছাশক্তি ও জনমতকে সমন্বয় করা চ্যালেঞ্জের মুখে থাকবে।
বিশ্লেষকরা ইঙ্গিত করছেন, গঙ্গা চুক্তির মেয়াদ শেষের আগে যদি নতুন চুক্তি না করা হয়, তবে উভয় দেশের মধ্যে জলসম্পদ নিয়ে বিরোধের সম্ভাবনা বাড়বে। বিশেষ করে বন্যা, শুষ্কতা ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে, জল নিরাপত্তা একটি কৌশলগত অগ্রাধিকার হয়ে উঠবে।
সারসংক্ষেপে, গঙ্গা জলবণ্টন চুক্তির মেয়াদ শেষের দিকে বাংলাদেশের জল নীতি পুনর্গঠন, যুব আন্দোলনের চাহিদা ও আঞ্চলিক কূটনীতির জটিলতা একত্রে নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা গড়ে তুলছে। ভবিষ্যতে কীভাবে এই বিষয়গুলো সমাধান হবে, তা দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ওপর নির্ভরশীল থাকবে।



