মিয়ানমারের রাজধানী নেপিদোর দক্ষিণে অবস্থিত বাগো অঞ্চলে ৩০ ডিসেম্বর স্থানীয় সময় সকাল ৭:৩০ টায় পিপলস ডিফেন্স ফোর্স (PDF) সমন্বিত আক্রমণ চালায়। সিত্তাং নদীর পূর্ব ও পশ্চিম তীরে জান্তা সেনাবাহিনীর অবস্থান লক্ষ্য করে এই হামলা অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে একাধিক ক্যাম্পে একসঙ্গে গুলি চালানো হয়।
প্রথম লক্ষ্যবস্তু ছিল একটি ক্যাম্প, যেখানে প্রায় চল্লিশজন সরকারি সৈন্য অবস্থান করছিল। এই আক্রমণে দুইজন সৈন্যের মৃত্যু হয় এবং PDF কিছু অস্ত্র ও গোলাবারুদ জব্দ করে।
একই দিনে PDF আর দুইটি স্থানে আক্রমণ চালায়। এই আক্রমণগুলোতে আরও বেশ কয়েকজন জান্তা সৈন্য প্রাণ হারায় এবং বিপুল পরিমাণ গোলাবারুদ কেড়ে নেওয়া হয়। দিনভর দুপক্ষের মধ্যে তীব্র গুলিবর্ষণ চলতে থাকে, ফলে আশেপাশের গ্রামগুলোতে ভয় ছড়িয়ে পড়ে এবং বহু পরিবার নিরাপত্তার জন্য তাদের বাড়ি ত্যাগ করে।
এই সংঘর্ষের পটভূমি হল ২৮ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনের প্রথম ধাপের ভোটগ্রহণ। ২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর চার বছর পর জান্তা সরকার আবার নির্বাচন পরিচালনা করে, যেখানে ইউনিয়ন সলিডারিটি অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টি (USDP) বিজয় দাবি করে। মানবাধিকার সংস্থা ও পর্যবেক্ষকরা জান্তা সেনাবাহিনীর হুমকির কারণে অনেক ভোট কেন্দ্র শূন্য বা ভয়ভীত ভোটারদের দ্বারা পূর্ণ হয়েছে বলে অভিযোগ তুলেছে।
বিশ্লেষকরা উল্লেখ করছেন, এই নির্বাচন প্রকৃত গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া নয়, বরং সামরিক শাসনের বৈধতা বাড়ানোর একটি কৌশল হিসেবে দেখা হচ্ছে। নির্বাচনী পরিবেশে গৃহীত নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও সশস্ত্র হুমকি দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাকে আরও ক্ষুণ্ণ করছে।
আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতিক্রিয়া তীব্র। জাতিসংঘের সিক্রেটারি-জেনারেল অফিস মিয়ানমারের নিরাপত্তা অবনতির প্রতি উদ্বেগ প্রকাশ করে এবং সকল পক্ষকে সহিংসতা বন্ধ করে রাজনৈতিক সংলাপে ফিরে আসার আহ্বান জানায়। ASEANের একটি যৌথ বিবৃতি অঞ্চলে শান্তি ও স্থিতিশীলতা রক্ষার জন্য উভয় পক্ষকে আত্মসংযম বজায় রাখতে নির্দেশ দেয়। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় উল্লেখ করেছে, চলমান সংঘর্ষ আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও মানবিক পরিস্থিতিকে হুমকির মুখে ফেলতে পারে, তাই দ্রুত সমাধান প্রয়োজন। ইউরোপীয় ইউনিয়নও অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনৈতিক প্রক্রিয়া ও মানবাধিকার রক্ষার জন্য মিয়ানমারকে চাপ দিচ্ছে।
এই ঘটনার ফলে মিয়ানমারের সীমান্তবর্তী দেশগুলোর কূটনৈতিক উদ্বেগ বাড়ছে। বাংলাদেশ, ভারত ও থাইল্যান্ডের নিরাপত্তা সংস্থাগুলি সীমান্তে শরণার্থীর প্রবাহ ও অস্ত্র পাচার নিয়ন্ত্রণে অতিরিক্ত সতর্কতা অবলম্বন করছে। একই সঙ্গে, আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক দলগুলোর মিয়ানমার ভেতরে মানবিক সহায়তা পৌঁছানোর সক্ষমতা সীমিত হয়ে পড়েছে।
পরবর্তী কয়েক সপ্তাহে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে নির্বাচনের পরবর্তী ধাপ অনুষ্ঠিত হবে, যা আবার নিরাপত্তা পরিস্থিতি তীব্র করতে পারে। PDF ও জান্তা সেনাবাহিনীর মধ্যে সংঘর্ষের ধারাবাহিকতা, পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সংস্থার সম্ভাব্য হস্তক্ষেপ, মিয়ানমারের রাজনৈতিক ও মানবিক সংকটের দিকনির্দেশ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।



