দ্বিপাক্ষিক সরকারী সভায় জাতীয় নগর উন্নয়ন নীতি‑২০২৫ অনুমোদিত হয়েছে, যা দেশের দ্রুত নগরায়ণকে পরিকল্পিত ও টেকসই পথে পরিচালিত করার লক্ষ্য রাখে। অনুমোদনটি বৃহস্পতিবার চিফ অ্যাডভাইজারের অফিসে অনুষ্ঠিত উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকে নেওয়া হয়, যেখানে প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনুস সভার প্রধান ছিলেন। পরে চিফ অ্যাডভাইজারের প্রেস সেক্রেটারি শফিকুল আলম ঢাকার ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে মিডিয়াকে নীতির মূল বিষয়বস্তু ব্যাখ্যা করেন।
এই নীতি দেশের প্রথম সমন্বিত নগর উন্নয়ন নীতি, যা ২১ বছরের দেরি শেষে কার্যকর হয়েছে। বর্তমানে প্রায় পাঁচ কোটি মানুষ, অর্থাৎ মোট জনসংখ্যার ৩২ শতাংশ, শহরে বসবাস করলেও পূর্বে কোনো সমগ্র নীতি ছিল না। নীতি অনুসারে শহর ও গ্রামাঞ্চলের বিকেন্দ্রীকরণ এবং টেকসই উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দিয়ে নগর বাসীর সামাজিক-অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি নিশ্চিত করা হবে।
নীতির বাস্তবায়নের জন্য একটি জাতীয় নগর উন্নয়ন পরিষদ গঠন করা হবে, যার সচিবালয় হিসেবে স্থানীয় সরকার বিভাগ কাজ করবে। এই পরিষদ নগর পরিকল্পনা, বিনিয়োগ ও পরিবেশ সংরক্ষণ সংক্রান্ত নীতির তদারকি করবে এবং সংশ্লিষ্ট সব স্তরের সরকারকে সমন্বয় করবে।
শহরগুলোকে চারটি শ্রেণিতে ভাগ করা হয়েছে: এক কোটি ও তার বেশি জনসংখ্যার মেগাসিটি, ৫ লক্ষ থেকে এক কোটি জনসংখ্যার মেট্রোপলিটন সিটি, ৫০ হাজার থেকে ৫ লক্ষ জনসংখ্যার মাঝারি বা জেলা শহর, এবং ২০ হাজার থেকে ৫০ হাজার জনসংখ্যার উপজেলা ও ছোট শহর। এই শ্রেণিবিন্যাসের ভিত্তিতে প্রতিটি শহরের ভূমিকা ও দায়িত্ব নির্ধারিত হয়েছে।
মেগাসিটিগুলোতে জনসংখ্যা চাপ কমাতে শিল্প প্রতিষ্ঠানের সম্প্রসারণ সীমিত করা হবে, আর অন্যান্য অঞ্চলগুলোতে বিনিয়োগের উৎসাহ বাড়ানো হবে। মেট্রোপলিটন সিটিগুলোকে আঞ্চলিক হাব হিসেবে গড়ে তোলা হবে, যেখানে পরিবহন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র থাকবে। মাঝারি বা জেলা শহরগুলোকে কৃষি-প্রক্রিয়াকরণ ও বাণিজ্যের কেন্দ্র হিসেবে উন্নীত করা হবে, যাতে গ্রামীণ উৎপাদন শহরে সহজে পৌঁছায়।
উপজেলা ও ছোট শহরগুলোকে প্রশাসনিক ও পেশাগত সেবা প্রদানকারী হিসেবে গড়ে তোলা হবে, যা কৃষক ও গ্রামীণ উৎপাদকের পণ্যবিনিময়কে সহজ করবে। এভাবে নগর-গ্রামীণ সংযোগ শক্তিশালী হয়ে সমগ্র দেশের অর্থনৈতিক ভারসাম্য রক্ষা পাবে।
বাংলাদেশ পরিকল্পনাবিদ সংস্থার পূর্বতন সভাপতি আদিল মোহাম্মদ খান নীতি সম্পর্কে মন্তব্য করেন যে, এটি এক দশকেরও বেশি সময় ধরে খসড়া পর্যায়ে আটকে ছিল এবং পূর্বে নগরায়ণকে নির্দেশনা দেয়ার কোনো সঠিক আইন বা নীতি ছিল না। তিনি উল্লেখ করেন, এখন নীতি কার্যকর হলে নগর পরিকল্পনা ও উন্নয়নে কাঠামোগত দিকনির্দেশনা পাব।
অধিকন্তু, নীতি অনুযায়ী স্থানীয় সরকার বিভাগকে নীতি বাস্তবায়নের তদারকি, নগর পরিকল্পনা অনুমোদন ও পর্যবেক্ষণ, এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় কাজ করতে হবে। এতে করে কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় স্তরের পরিকল্পনা একসঙ্গে কাজ করবে, যা নগরায়ণের অপ্রতিবন্ধিত প্রবাহ রোধে সহায়ক হবে।
এই নীতির মাধ্যমে সরকার জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবেলায় নগর অবকাঠামোকে টেকসই ও জলবায়ু-প্রতিরোধী করে তোলার পরিকল্পনা করেছে। সবুজ স্থান, সাইকেল লেন ও পাবলিক ট্রান্সপোর্টের উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দিয়ে শহরের বাসযোগ্যতা বাড়ানো হবে।
রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা যায়, নীতি অনুমোদন সরকারকে নগর উন্নয়নের ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদী দৃষ্টিভঙ্গি প্রদর্শন করার সুযোগ দেয়। এটি শহর-গ্রাম পার্থক্য কমিয়ে সমগ্র দেশের সমন্বিত উন্নয়নে সহায়তা করবে এবং ভবিষ্যতে নগর পরিকল্পনা সংক্রান্ত বিতর্কের ভিত্তি সরবরাহ করবে।
পরবর্তী ধাপে নীতির বিস্তারিত কার্যকরী পরিকল্পনা তৈরি, বাজেট বরাদ্দ এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থার সমন্বয় সভা অনুষ্ঠিত হবে। এছাড়া, নীতি বাস্তবায়নের পর্যবেক্ষণ ও মূল্যায়নের জন্য স্বতন্ত্র তদারকি কমিটি গঠন করা হবে, যাতে নীতির লক্ষ্য অর্জনে সময়মতো সমন্বয় করা যায়।



