বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি অর্থবছর (২০২৫-২৬) জুলাই থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশে প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্সের পরিমাণ ১,৬২৬ কোটি ৩৯ লাখ ৪০ হাজার মার্কিন ডলার, অর্থাৎ ১৬.২৬ বিলিয়ন ডলার হয়েছে। একই সময়ে গত অর্থবছরের রেমিট্যান্স ১,৩৭৭ কোটি ৫৮ লাখ ৮০ হাজার ডলার ছিল, ফলে এই ছয় মাসে রেমিট্যান্সে ২৪৮ কোটি ৮০ লাখ ৬০ হাজার ডলার, বা ১৮.০৫ শতাংশের বৃদ্ধি দেখা গেছে।
এই তথ্য ১ জানুয়ারি প্রকাশিত হালনাগাদ প্রতিবেদনে প্রকাশিত হয়েছে। বছরের শেষের দিকে রেমিট্যান্স প্রবাহ বিশেষভাবে উজ্জ্বল ছিল; ডিসেম্বর মাসে একক মাসে ৩.২২ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স দেশে পৌঁছায়, যা চলতি অর্থবছরের সর্বোচ্চ এবং দেশের ইতিহাসে এক মাসে প্রাপ্ত রেমিট্যান্সের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ পরিমাণ হিসেবে রেকর্ড হয়।
ডিসেম্বর মাসের রেমিট্যান্সের উৎস বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে ৫৭ কোটি ২৩ লাখ ৬০ হাজার ডলার, বিশেষায়িত ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে ৩৫ কোটি ৩৫ লাখ ২০ হাজার ডলার, বেসরকারি ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে ২৯৯ কোটি ৩৯ লাখ ৪০ হাজার ডলার এবং বিদেশি ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে ৬৮ লাখ ৭০ হাজার ডলার রেমিট্যান্স প্রবাহিত হয়েছে। এই বিভাজন দেখায় যে বেসরকারি আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো রেমিট্যান্স সংগ্রহে প্রধান ভূমিকা পালন করছে, যা দেশের আর্থিক অন্তর্ভুক্তি ও ডিপোজিট বৃদ্ধিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
সম্পূর্ণ ২০২৪-২৫ অর্থবছরে প্রবাসীরা মোট ৩০.৩২ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন, যা পূর্বের কোনো অর্থবছরে রেকর্ড করা সর্বোচ্চ পরিমাণ। এই ঐতিহাসিক রেকর্ড দেশের বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভে সরাসরি অবদান রাখবে এবং মুদ্রা বাজারের স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সহায়তা করবে। রেমিট্যান্সের ধারাবাহিক বৃদ্ধি দেশের ভোক্তা ব্যয়, হাউজিং সেক্টর এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগ (SME) তে তহবিলের প্রবাহ বাড়াবে বলে আশা করা যায়।
বাজার বিশ্লেষকরা রেমিট্যান্সের এই উত্থানকে দুইটি মূল কারণের সঙ্গে যুক্ত করছেন। প্রথমত, গ্লোবাল অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার এবং প্রবাসী কর্মীদের বেতন বৃদ্ধির ফলে পাঠানো অর্থের পরিমাণ বাড়ছে। দ্বিতীয়ত, ডিজিটাল পেমেন্ট প্ল্যাটফর্ম ও মোবাইল ব্যাংকিং সেবার বিস্তারের ফলে রেমিট্যান্সের প্রেরণ প্রক্রিয়া সহজ ও দ্রুত হয়েছে, যা প্রবাসীদের জন্য আর্থিক লেনদেনের খরচ কমিয়ে দিয়েছে।
তবে, রেমিট্যান্সের প্রবাহে কিছু ঝুঁকিও বিদ্যমান। বৈশ্বিক মুদ্রা বাজারে অস্থিরতা, বিশেষ করে ডলারের মানের ওঠানামা রেমিট্যান্সের প্রকৃত মূল্যে প্রভাব ফেলতে পারে। এছাড়া, রেমিট্যান্সের উপর নির্ভরশীল গৃহস্থালির ব্যয় প্যাটার্নে পরিবর্তন হলে অর্থনৈতিক নীতি প্রণয়নে চ্যালেঞ্জ দেখা দিতে পারে। তাই, নীতি নির্ধারকদের রেমিট্যান্সের প্রবাহকে স্থিতিশীল রাখতে বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনা এবং আর্থিক অন্তর্ভুক্তি নীতিগুলোকে সমন্বিতভাবে গঠন করা জরুরি।
সারসংক্ষেপে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথমার্ধে রেমিট্যান্সে ১৮ শতাংশের উল্লিখিত বৃদ্ধি দেশের বৈদেশিক মুদ্রা অবস্থানকে শক্তিশালী করেছে এবং ভোক্তা বাজারে ত্বরান্বিত প্রবাহের সম্ভাবনা তৈরি করেছে। বেসরকারি ব্যাংক ও ডিজিটাল আর্থিক সেবার ভূমিকা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে রেমিট্যান্সের গতি ত্বরান্বিত হবে বলে অনুমান করা যায়। তবে, বৈশ্বিক মুদ্রা অস্থিরতা ও রেমিট্যান্সের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা থেকে উদ্ভূত ঝুঁকি মোকাবিলায় নীতিগত পদক্ষেপের প্রয়োজনীয়তা স্পষ্ট।
ভবিষ্যৎ প্রবণতা নির্ধারণে দেখা যাবে, রেমিট্যান্সের পরিমাণ কি ধারাবাহিকভাবে বৃদ্ধি পাবে নাকি বৈশ্বিক অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের কারণে স্থবির হবে। তদুপরি, রেমিট্যান্সের ব্যবহারিক দিক—যেমন হাউজিং ঋণ, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগ—বৃদ্ধি পাবে কিনা, তা দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক উন্নয়নের সূচক হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।



