নির্বাচন কেন্দ্রের সামনে ভোটারদের দেখা যায়, কেউই ভোট না দিলেও তার ভোট অন্য কেউ ইতিমধ্যে দিয়েছে বলে দাবি করা হয়। এমন পরিস্থিতি মোকাবিলায় নির্বাচন কমিশনের নিয়মে ‘টেন্ডার্ড ব্যালট পেপার’ এবং ‘চ্যালেঞ্জড ব্যালট পেপার’ উভয়ের জন্য বিশেষ বিধান রয়েছে।
টেন্ডার্ড ব্যালট পেপার হল সেই ভোট যেখানে ভোটার নিজে উপস্থিত না থাকলেও তার নামে অন্য কেউ ভোট দেয়। এই ভোটকে প্রায়শই ‘সান্ত্বনা ভোট’ বলা হয়, তবে নির্বাচন কমিশনার মো. আনোয়ারুল ইসলাম সরকারের মতে, এটি আলাদা খামে প্রিজাইডিং অফিসার সিল করে জমা দিতে হবে এবং এটি গণনা থেকে বাদ থাকবে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, “এ ধরনের ভোটকে সান্ত্বনা ভোট বলা যাবে না, আরপিওতে যেভাবে বলা হয়েছে, সেভাবেই উল্লেখ করা হোক।”
প্রযোজ্য বিধানটি নির্বাচন আইন সংহিতা আরপিওর ধারা ৩২ (১) এ স্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে। এতে বলা হয়েছে, যদি কোনো ব্যক্তি জানেন যে অন্য কেউ তার নামে ভোট দিয়েছে, তবে তিনি একই প্রক্রিয়ায় একটি নতুন ব্যালট পেপার (টেন্ডার্ড ব্যালট পেপার) পাওয়ার অধিকারী হবেন। এই ব্যালট পেপারটি ভোটের বাক্সে ফেলা যায় না; প্রিজাইডিং কর্মকর্তা আলাদা খামে সংরক্ষণ করেন।
টেন্ডার্ড ভোটের বাস্তব উদাহরণ প্রথমবার ১১তম সংসদ নির্বাচনের সময় ‘নিশিরাতের ভোট’ নামে পরিচিত হয়। তখনই ভোটারদের উপস্থিতি না থাকলেও তাদের নামে ভোট দেওয়া হয় এবং পরে তা টেন্ডার্ড ব্যালট পেপার হিসেবে রেকর্ড করা হয়। এই প্রক্রিয়া ভোটারদের অধিকার রক্ষা করার পাশাপাশি সম্ভাব্য বিরোধ এড়াতে সহায়তা করে।
অন্যদিকে, চ্যালেঞ্জড বা আপত্তিকৃত ভোটের ক্ষেত্রে ভোটটি গণনা করা হয়। যখন কোনো ব্যক্তি তার নামের সঙ্গে ভোট পেয়েছে বলে দাবি করেন, কিন্তু এজেন্ট বা অন্য কোনো প্রার্থী তার পরিচয় নিয়ে আপত্তি তোলেন, তখন ভোটটি চ্যালেঞ্জড হিসেবে চিহ্নিত হয়। নির্বাচন কমিশনার আবদুর রহমানের মতে, “এ ব্যালট পেপারে আপত্তি দিয়ে রাখা হবে এবং গণনাও হবে। উদাহরণস্বরূপ, কেউ যদি ‘আমি এক্স’ বলে, কিন্তু এজেন্ট ‘উনি এক্স নয়, ওয়াই’ বলে আপত্তি তোলেন, তবে ভোটটি চ্যালেঞ্জড হিসেবে গণ্য হবে।”
চ্যালেঞ্জড ভোটের জন্য প্রার্থীরা ১০০ টাকা ফি সহ দরখাস্ত জমা দিতে পারেন, যা ভোটের বৈধতা নিশ্চিত করার প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করে। এই ফি এবং দরখাস্তের মাধ্যমে ভোটের আপত্তি আনুষ্ঠানিকভাবে রেকর্ড হয় এবং গণনা প্রক্রিয়ায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
টেন্ডার্ড ও চ্যালেঞ্জড ভোটের পার্থক্য স্পষ্ট করা নির্বাচন প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা বাড়ায়। টেন্ডার্ড ভোট মূলত ভোটারকে তার ভোটের নিশ্চয়তা দেয়, যদিও তা গণনা হয় না; অন্যদিকে চ্যালেঞ্জড ভোটের ক্ষেত্রে ভোটের বৈধতা যাচাই করা হয় এবং তা গণনায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
এই বিধানগুলো বিশেষ করে গ্রামীণ এলাকায় গুরুত্বপূর্ণ, যেখানে ভোটারদের উপস্থিতি সীমিত হতে পারে এবং এজেন্টদের দ্বারা ভোটের দখল নিয়ে বিরোধ সৃষ্টি হয়। টেন্ডার্ড ভোটের মাধ্যমে ভোটারকে ‘সান্ত্বনা’ দেওয়া হলেও, এর অগণনা ভোটের মোট ফলাফলে প্রভাব না ফেলায় ভোটের সঠিকতা বজায় থাকে।
অন্যদিকে, চ্যালেঞ্জড ভোটের সঠিক রেকর্ডিং এবং গণনা নিশ্চিত করে যে কোনো আপত্তি যথাযথভাবে বিবেচিত হয়, ফলে ভোটের ফলাফলে অবৈধ প্রভাব কমে। এই প্রক্রিয়া নির্বাচন কমিশনের স্বচ্ছতা ও ন্যায়বিচার বজায় রাখার মূল ভিত্তি।
নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তারা উল্লেখ করেন, টেন্ডার্ড ভোটের ক্ষেত্রে প্রিজাইডিং অফিসারকে আলাদা খামে সিল করে জমা দিতে হবে এবং তা ‘আউট অব কাউন্ট’ হিসেবে গণ্য হবে। ফলে, এই ভোটের সংখ্যা মোট ভোটের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত না হয়ে, ভোটের শতাংশে কোনো পরিবর্তন আনে না।
চ্যালেঞ্জড ভোটের ক্ষেত্রে, আপত্তি উত্থাপনের পর তা রেকর্ডে চিহ্নিত হয় এবং গণনা প্রক্রিয়ায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এই প্রক্রিয়া ভোটার ও প্রার্থীর উভয়ের অধিকার রক্ষা করে এবং ফলাফলে কোনো অনিয়মের সম্ভাবনা কমায়।
ভবিষ্যতে এই বিধানগুলোর প্রয়োগ নির্বাচনের ফলাফলে প্রভাব ফেলতে পারে, বিশেষ করে যখন ভোটার সংখ্যা বৃদ্ধি পাবে এবং ভোটের দখল নিয়ে বিরোধ বাড়বে। টেন্ডার্ড ভোটের সঠিক রেকর্ডিং এবং চ্যালেঞ্জড ভোটের স্বচ্ছ গণনা নির্বাচন প্রক্রিয়ার বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়াবে।
অধিকন্তু, নির্বাচন কমিশনের এই স্পষ্ট নির্দেশনা ভোটারদের সচেতনতা বাড়াবে এবং ভোটের সময় উদ্ভূত জটিলতা কমাবে। ফলে, ভোটার ও প্রার্থীর মধ্যে বিরোধের সম্ভাবনা হ্রাস পাবে এবং নির্বাচন ফলাফলকে আরও নির্ভরযোগ্য করা সম্ভব হবে।
সারসংক্ষেপে, টেন্ডার্ড ভোট এবং চ্যালেঞ্জড ভোটের পার্থক্য ও প্রয়োগের নিয়মাবলী নির্বাচন কমিশনের নীতি অনুযায়ী স্পষ্ট করা হয়েছে। টেন্ডার্ড ভোট অগণনা হলেও ভোটারকে তার ভোটের নিশ্চয়তা দেয়, আর চ্যালেঞ্জড ভোট আপত্তি সহ গণনা হয়, যা ভোটের স্বচ্ছতা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করে। এই ব্যবস্থা ভবিষ্যৎ নির্বাচনে ভোটার অধিকার রক্ষায় এবং ফলাফলের বৈধতা বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।



