জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো (বিএমইটি) গত বছর একক দেশে সর্বোচ্চ সংখ্যক শ্রমিক প্রেরণ করে নতুন মাইলফলক স্থাপন করেছে। ২০২৫ সালে মাত্র এক বছরে ৭,৫০,০০০ বাংলাদেশি কর্মী সৌদি আরবে পাঠানো হয়েছে, যা পূর্বের কোনো রেকর্ডকে অতিক্রম করেছে।
এই সংখ্যা ২০২৪ সালের তুলনায় প্রায় ১৬ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। বর্তমানে সৌদিতে প্রায় ৩.৫ কোটি বাংলাদেশি কর্মরত, যারা প্রত্যেক বছর প্রায় ৫০০ কোটি ডলারের বেশি রেমিট্যান্স দেশের অর্থনীতিতে ফিরিয়ে আনছে।
বিএমইটির অতিরিক্ত মহাপরিচালক আশরাফ হোসেন জানান, গত বছর মোট ১১ লক্ষের বেশি কর্মী বিদেশে গিয়েছেন, যার মধ্যে দুই-তৃতীয়াংশের বেশি শ্রমিক সৌদি আরবকে বেছে নিয়েছেন। ভিশন ২০৩০ প্রকল্পের অধীনে নির্মাণ ও উন্নয়ন খাতে বিশাল চাহিদা এই প্রবাহকে ত্বরান্বিত করেছে।
সরকারের নীতি এখন অদক্ষ শ্রমিকের বদলে দক্ষ জনশক্তি রপ্তানির দিকে বেশি জোর দিচ্ছে। ২০২৩ সালে চালু হওয়া সৌদি স্কিল ভেরিফিকেশন প্রোগ্রামের মাধ্যমে গত বছরের প্রেরিত শ্রমিকের এক-তৃতীয়াংশকে দক্ষ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে।
দক্ষতা যাচাই প্রক্রিয়ার গতি বাড়াতে দেশজুড়ে সৌদি অনুমোদিত পরীক্ষা কেন্দ্রের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করা হয়েছে। কয়েক মাস আগে যেখানে মাসে এক হাজার শ্রমিকের দক্ষতা যাচাই করা সম্ভব হতো, এখন ২৮টি সেন্টারের মাধ্যমে প্রায় ষাট হাজার কর্মীর পরীক্ষা নেওয়া যায়।
বিএমইটি বিশেষভাবে খনি খাতে দক্ষ শ্রমিকের চাহিদা মেটাতে নতুন প্রশিক্ষণ কর্মসূচি চালু করেছে। এই উদ্যোগের মাধ্যমে ভবিষ্যতে খনি প্রকল্পে কাজ করার জন্য প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগত জ্ঞানসম্পন্ন কর্মী গড়ে তোলা হবে।
শ্রমিকের নিরাপত্তা ও অধিকার রক্ষার লক্ষ্যে গত অক্টোবর মাসে বাংলাদেশ ও সৌদি আরবের মধ্যে একটি নতুন চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। চুক্তিতে বেতন সময়মতো প্রদান, স্বাস্থ্যসেবা সুবিধা এবং সামগ্রিক কল্যাণ নিশ্চিত করার বিধান অন্তর্ভুক্ত।
এই চুক্তি শ্রমিকের কাজের পরিবেশ উন্নত করার পাশাপাশি রেমিট্যান্স প্রবাহের স্থায়িত্ব বাড়াবে বলে আশা করা হচ্ছে। নিরাপদ কর্মপরিবেশ এবং সামাজিক সুরক্ষা প্যাকেজের ফলে শ্রমিকের উৎপাদনশীলতা ও সন্তুষ্টি বৃদ্ধি পাবে।
বিশেষজ্ঞরা উল্লেখ করছেন, সৌদি আরবের মেগা প্রকল্পগুলোতে ২০২৬ সালের মধ্যে অতিরিক্ত তিন লক্ষ কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে। এই নতুন সুযোগগুলো মূলত অবকাঠামো, জ্বালানি এবং শিল্প খাতে কেন্দ্রীভূত হবে।
বিএমইটি ইতিমধ্যে এই সম্ভাব্য চাহিদা পূরণের জন্য দক্ষ কর্মী প্রস্তুতিতে প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের সক্ষমতা বাড়াচ্ছে। লক্ষ্য হচ্ছে শ্রমিকদের আন্তর্জাতিক মানের দক্ষতা প্রদান করে রপ্তানি বাজারে প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান নিশ্চিত করা।
বাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, শ্রমিক রপ্তানির এই ধারাবাহিক বৃদ্ধি বাংলাদেশের বাণিজ্যিক ভারসাম্যকে শক্তিশালী করবে। রেমিট্যান্সের প্রবাহ বাড়ার ফলে ভোক্তা ব্যয়, বিনিয়োগ এবং মুদ্রা সঞ্চয় সব ক্ষেত্রেই ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
সারসংক্ষেপে, ২০২৫ সালে সৌদিতে কর্মী প্রেরণের রেকর্ড ভাঙা শুধু শ্রমিকের জন্য নয়, দেশের অর্থনৈতিক কাঠামোর জন্যও গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। দক্ষতা যাচাই, প্রশিক্ষণ ও শ্রমিক কল্যাণে জোর দিয়ে সরকার ও সংশ্লিষ্ট সংস্থা ভবিষ্যতে আরও স্থিতিশীল ও লাভজনক রপ্তানি মডেল গড়ে তুলতে সক্ষম হবে।



