চীনের সাইবারস্পেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন সম্প্রতি একটি খসড়া নীতি প্রকাশ করেছে, যার লক্ষ্য হল মানবসদৃশ কথোপকথন সক্ষম এআই চ্যাটবটের মাধ্যমে ব্যবহারকারীর আবেগকে প্রভাবিত করা বা আত্মহত্যা‑প্রণোদনা দেওয়া রোধ করা। এই প্রস্তাবের অধীনে নির্দিষ্ট সেবা গুলোকে সীমাবদ্ধ করা হবে এবং জনমত জানার শেষ তারিখ ২৫ জানুয়ারি নির্ধারিত হয়েছে।
নিয়মের মূল শর্তে বলা হয়েছে, এআই‑চালিত কথোপকথন সেবা ব্যবহারকারীকে আত্মহত্যা বা স্ব‑আহতিতে উৎসাহিত করতে পারে না। এজন্য ডেভেলপারদের এমন সুরক্ষা ব্যবস্থা সংযোজন করতে হবে, যা ব্যবহারকারীর ক্ষতিকারক অনুরোধ শনাক্ত করে তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে বন্ধ করে দেয়।
এই নীতি বিশেষভাবে ‘মানুষের মতো আলাপ করতে পারে এমন এআই পরিষেবা’কে লক্ষ্য করে, যা চীনের বাজারে দ্রুত জনপ্রিয়তা পাচ্ছে। ভার্চুয়াল সঙ্গী, ডিজিটাল তারকা এবং অন্যান্য ব্যক্তিত্ব‑ভিত্তিক বটগুলোই এই শ্রেণিতে পড়ে, যেখানে ব্যবহারকারীকে ব্যক্তিগতকৃত কথোপকথন ও মানসিক সমর্থন দেওয়া হয়।
প্রস্তাবিত নীতির পূর্ণ পাঠ্য অনলাইনে উপলব্ধ, এবং সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষ—বিশেষজ্ঞ, শিল্প সংস্থা এবং সাধারণ নাগরিক—কে ২৫ জানুয়ারি পর্যন্ত মন্তব্য জমা দিতে বলা হয়েছে। মন্তব্যগুলো সরাসরি সাইবারস্পেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের পোর্টালের মাধ্যমে গ্রহণ করা হবে।
বৈশ্বিক আইনি বিশ্লেষকরা উল্লেখ করছেন, এই ধরনের নিয়মাবলী আবেগগত প্রভাব নিয়ন্ত্রণে প্রথম জাতীয় উদ্যোগ। নিউ ইয়র্ক ইউনিভার্সিটি স্কুল অফ ল‑এর পার্ট‑টাইম অধ্যাপক উইনস্টন মা বলেন, বেইজিংয়ের এই পরিকল্পনা এআই‑এর মানব‑সদৃশ আচরণকে নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে একটি অগ্রগতি।
চীনের প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এআই সঙ্গী ও ডিজিটাল তারকা তৈরিতে ত্বরান্বিত হয়েছে, যা ব্যবহারকারীর সঙ্গে ব্যক্তিগত কথোপকথন, বিনোদন এবং কখনো কখনো মানসিক সমর্থন প্রদান করে। এই সেবার দ্রুত বিস্তারই নিয়ন্ত্রকদের উদ্বেগ বাড়িয়ে তুলেছে, কারণ অনিচ্ছাকৃতভাবে ভুল তথ্য বা মানসিক চাপ সৃষ্টির ঝুঁকি রয়েছে।
২০২৩ সালের এআই নীতিমালার তুলনায়, যা মূলত তথ্য নিরাপত্তা ও কন্টেন্ট নিয়ন্ত্রণে কেন্দ্রীভূত ছিল, নতুন খসড়া মানসিক ও আবেগগত নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। প্রশাসন জোর দিয়ে বলছে, ব্যবহারকারীর মানসিক স্বাস্থ্যের সুরক্ষা তথ্যের সুরক্ষার সমান গুরুত্বপূর্ণ।
নিয়ম গৃহীত হলে, কোম্পানিগুলোকে রিয়েল‑টাইম মনিটরিং, ব্যবহারকারী সম্মতি প্রক্রিয়া এবং কোনো ক্ষতিকারক প্রতিক্রিয়া ঘটলে তা রিপোর্ট করার ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। এই শর্তগুলো মানতে ব্যর্থ হলে জরিমানা, সেবা স্থগিত বা লাইসেন্স বাতিলের মতো শাস্তি আরোপের সম্ভাবনা রয়েছে।
প্রস্তাবে মানসিক স্বাস্থ্য পেশাদারদের সঙ্গে সহযোগিতা করেও বটের প্রতিক্রিয়া প্রোটোকল গড়ে তোলার আহ্বান জানানো হয়েছে, যাতে ব্যবহারকারী কোনো সংকটের চিহ্ন দেখালে তাৎক্ষণিকভাবে পেশাদার সহায়তার দিকে নির্দেশ করা যায়।
বিশ্বের অন্যান্য দেশগুলোও চীনের এই নিয়ন্ত্রক পদক্ষেপকে ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ করছে, কারণ আবেগগত নিরাপত্তা নিয়ে গৃহীত নীতি ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের রেফারেন্স হতে পারে। এআই পণ্যের নকশা ও পরিচালনায় এই ধরনের দৃষ্টিভঙ্গি নতুন মানদণ্ড স্থাপন করতে পারে।
চীনের সাম্প্রতিক নিয়ন্ত্রক পদক্ষেপগুলো—ডিপফেক, মুখমণ্ডল সনাক্তকরণ এবং অন্যান্য এআই‑চালিত প্রযুক্তি নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে—একটি বিস্তৃত কৌশলের অংশ, যা উদীয়মান প্রযুক্তির ঝুঁকি কমাতে লক্ষ্যভিত্তিক।
মন্তব্যের সময়সীমা সমাপ্তির দিকে এগিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে, শিল্পখাতের প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের উন্নয়ন প্রক্রিয়া পুনর্বিবেচনা করে নতুন শর্ত পূরণের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে। একই সঙ্গে ভোক্তা সংস্থাগুলোও ব্যবহারকারীর এআই সঙ্গে মিথস্ক্রিয়ার নিরাপত্তা নিশ্চিত করার স্পষ্ট নির্দেশনার প্রত্যাশা করছে।



