ইয়েমেনের দক্ষিণে সাম্প্রতিক সামরিক সংঘর্ষের ফলে সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) প্রথমবার সরাসরি মুখোমুখি হয়েছে; দুই গাল্ফ শক্তির এই টানাপোড়েন দেশের ভবিষ্যৎকে বিভাজনের প্রান্তে নিয়ে এসেছে। উভয় দেশই আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেন সরকারকে সমর্থন করে আসছে, তবে এখন তারা ভিন্ন ভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর পক্ষে দাঁড়িয়ে আছে, যার মধ্যে একটি গোষ্ঠী দক্ষিণে স্বাধীন রাষ্ট্রের দাবি তুলে ধরছে।
ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধ ২০১৪ সালে হুথি গোষ্ঠীর আক্রমণে শুরু হয়, যখন ইরান সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীরা রাজধানী সানায়সহ উত্তর ইয়েমেনের বেশিরভাগ অঞ্চল দখল করে। সরকারী বাহিনী দ্রুত পিছিয়ে যায় এবং দেশটি দীর্ঘমেয়াদী সশস্ত্র সংঘাতে নিমজ্জিত হয়।
২০১৫ সালে সৌদি আরব, ইউএই এবং অন্যান্য আরব দেশ সমন্বিত একটি জোট গঠন করে হুথি বিদ্রোহ দমন ও সরকারী নিয়ন্ত্রণ পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য সামরিক অভিযান চালায়। এই জোটের মধ্যে ইউএই ও সৌদি আরবের ভূমিকা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ ছিল; দুজনেই তেল-সম্পদ সমৃদ্ধ অঞ্চলে তাদের স্বার্থ রক্ষার জন্য সক্রিয়ভাবে হস্তক্ষেপ করেছে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে হুথি গোষ্ঠীর সঙ্গে একটি স্থিতিশীল অস্থায়ী বিরতি অর্জিত হয়েছে, যা সীমান্ত রেখা স্থবির রাখে এবং সামরিক কার্যক্রমের তীব্রতা কমায়। তবে এই অস্থিরতা গুলিয়ে দিয়েছে গাল্ফ জোটের অভ্যন্তরীণ সমন্বয়কে।
২০২২ সালে গঠন করা প্রেসিডেন্সিয়াল লিডারশিপ কাউন্সিল (PLC) হুথি-বিরোধী বিভিন্ন গোষ্ঠীকে একত্রিত করার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছিল, তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই কাউন্সিলের ঐক্য ভেঙে পড়েছে। গোষ্ঠীগুলোর স্বার্থের পার্থক্য এবং নেতৃত্বের মধ্যে মতবিরোধের ফলে জোটের কার্যকারিতা হ্রাস পেয়েছে।
ইউএই সমর্থিত সাউদার্ন ট্রানজিশনাল কাউন্সিল (STC) দক্ষিণ ইয়েমেনের অধিকাংশ অংশ নিয়ন্ত্রণে নিয়ে এসেছে এবং আনুষ্ঠানিকভাবে জোটের অংশ হলেও তার স্বতন্ত্র স্বায়ত্তশাসন ও স্বাধীনতা দাবি জোটের মধ্যে উত্তেজনা বাড়িয়ে তুলেছে। STC-র লক্ষ্য হল দক্ষিণে একটি আলাদা রাষ্ট্র গঠন করা, যা গাল্ফ জোটের অভ্যন্তরীণ সমন্বয়কে আরও জটিল করে তুলেছে।
২ ডিসেম্বর STC একটি বিশাল সামরিক অভিযান চালিয়ে দেশের পূর্বাঞ্চলে দ্রুত অগ্রগতি অর্জন করে, হাদ্রামাউত প্রদেশসহ তেল-সমৃদ্ধ অঞ্চল দখল করে। হাদ্রামাউত সীমানা সংলগ্ন সৌদি আরবের জন্য কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ, ফলে এই জয় সৌদি নিরাপত্তা ও তেল সরবরাহের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারে।
শুক্রবার ইউএই-সমর্থিত গোষ্ঠী সরকারী বাহিনীর বিরুদ্ধে ‘যুদ্ধ’ শুরু হওয়ার ঘোষণা দেয় এবং সৌদি সমর্থিত ভূ-সামরিক বাহিনীর সঙ্গে সামরিক আক্রমণ ও সৌদি বিমানবাহিনীর বোমা হামলার অভিযোগ তুলে। এই ঘোষণার ফলে দু’দেশের মধ্যে সরাসরি সামরিক সংঘর্ষের সম্ভাবনা স্পষ্ট হয়ে দাঁড়ায়।
বিশ্লেষকরা ইঙ্গিত করছেন যে এই সংঘাতের তীব্রতা যদি বাড়ে, তবে ইয়েমেনের ভূখণ্ডিক অখণ্ডতা ভেঙে যেতে পারে এবং দেশটি দুইটি স্বতন্ত্র সত্তায় বিভক্ত হতে পারে। তদুপরি, হাদ্রামাউত প্রদেশের তেল উৎপাদন ও রপ্তানি বন্ধ হয়ে গেলে গ্লোবাল তেল বাজারে অস্থিরতা দেখা দিতে পারে, যা মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি নিরাপত্তাকে প্রভাবিত করবে।
সৌদি আরব সরকার এই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে আন্তর্জাতিক সমর্থন চাইছে এবং ইউএইকে যৌথ কৌশল অনুসরণে আহ্বান জানাচ্ছে। অন্যদিকে ইউএই তার দক্ষিণের স্বায়ত্তশাসন নীতি বজায় রাখতে জোর দিচ্ছে, যদিও এটি জোটের সামগ্রিক লক্ষ্যকে বিপন্ন করছে। যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং জাতিসংঘের প্রতিনিধিরা দু’দেশকে সংলাপের মাধ্যমে সমস্যার সমাধান করার আহ্বান জানিয়ে, মানবিক সংকটের তীব্রতা কমাতে জরুরি শান্তি চুক্তির প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরছে।
আসন্ন মাসগুলোতে জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় একটি নতুন শান্তি আলোচনার সূচনা হতে পারে, যেখানে প্রেসিডেন্সিয়াল লিডারশিপ কাউন্সিল, STC এবং হুথি গোষ্ঠীকে একত্রে টেবিলে বসিয়ে সমঝোতা গড়ে তোলার চেষ্টা করা হবে। তাছাড়া, সৌদি আরব ও ইউএইকে তাদের সামরিক উপস্থিতি হ্রাস করে রাজনৈতিক সমাধানের দিকে অগ্রসর হতে হবে, নতুবা ইয়েমেনের বিভাজন ও মানবিক বিপর্যয় আরও বাড়বে।
ইয়েমেনের ভবিষ্যৎ এখন গাল্ফ জোটের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের ওপর নির্ভরশীল, এবং এই দ্বন্দ্বের সমাধান না হলে দেশটি দীর্ঘমেয়াদী অস্থিরতা ও মানবিক সংকটের মুখে পড়তে পারে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সক্রিয় হস্তক্ষেপ এবং উভয় গাল্ফ শক্তির স্বার্থের সমন্বয়ই একমাত্র পথ হতে পারে ইয়েমেনকে পুনরায় একীভূত করার।



